
তোতলা সুভাষিনী (শ্রুতি নাটক)
(সুভাষ ও সুভাষিনীর সংসার, সুভাষ সবে রিটায়ার করেছে এক ছেলে বাইরে থাকে।সুভাষিনী তোতলা, কথার মাঝখানে কোন কোন শব্দ উচ্চারিত হয় না, মানে আটকে যায়। সকালে বিছানায় বসে চা খাওয়ায় ফাঁকে।)
সুভাষ-শরীরের গাঁটে গাঁটে জং ধরেছে। এখন শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখা ছাড়া আর উপায় কি?
সুভাষিনী -যাও না আকাশের তলায় মাঠে শোওগে।
সুভাষ-কি কি শব্দ বাদ গেল? ‘আকাশ’ ‘মাঠ’- খুব সুন্দর নাম তোমার, সু উউ, ভাষিনী কে রেখেছিল গো তোমার নাম?
সু -বাবা রেখেছিল।
সুভাষ- বাবা না মা কিছুই বুঝলাম না। এই বাদ দেওয়া শব্দগুলো বাদ রেখেই তো ৬০ পার করে দিলাম। শুধু তোমাকে বাদ দিতে পারিনি।
সু-সকালে ঘঁটিও না,বাজার যাবে না?
সুভাষ-সব যদি ‘না’ হয় আমি বাজার যাবো কেন? কি আনতে হবে তাই বল।
সু-পেট খারাপ কচি লাউ ডাঁটা আনবে।
সুভাষ – যত বয়স বাড়ছে তত তোতলামি বাড়ছে। আগে তো তো করে শব্দের প্রথম অক্ষরটি বলতে এখন দেখছি পুরো শব্দটাই উদাহ। ধর আমি যদি না থাকতাম তাহলে তোমার ওই ব্যাকরণ কে বুঝতো?
সু -ঠা … কুর।
সুভাষ-হুঁ-ঠাকুর! ঠাকুর কুকুর এক। যুগ পাল্টেছে শুধু তুমি পাল্টাওনি।
সু-এই ব্যাগ রইল।
সুভাষ -(বাজার থেকে ফিরে) এই নাও। বাপ রে, কি দাম জিনিসের, যেন আগুন লেগেছে।
সু-কোথায় আগুন লাগলো?
সুভাষ-আর কোথায়!সু-গুমটি না দোকানে?
সুভাষ-বাজারে।
সু-আর কি করবে? না খেয়ে তো উপোস থাকতে পারবো না।
সুভাষ-চিংড়ি হাজার টাকা। আড়াইশো আড়াইশো ই নিল।
সু-চিংড়ি কেন? আমি তো তোমায় চিংড়ি আনতে বলিনি। আমি বলেছিলাম পেট খারাপ কচি লাউ ডাঁটা আনতে।
সুভাষ-এ হুয়ি না বাত। তুমি বলেছিলে মন খারাপ কচি লাউ আনতে। পেট আর ডাঁটা তো তোমার পেটেই থেকে গেছে, মন আর কচি লাউর সঙ্গে আমি শুধু চিংড়ি জুড়েছি। সবই আমার কপাল। তোমার বাবা সুভাষিনী নাম না রেখে কুভাষিনী রাখলে ভালো করতো। বাজার যাওয়ার আগে এবার থেকে ফর্দ লিখবে। সাপ ও মরবে লাঠি ভাঙবে না। কেন যে লেখা পড়া করেছিলে?
সু-পড়েছি মনে মনে – লিখেছি পরীক্ষার খাতায়।তবেই না ডিগ্রি পেয়েছি। শুধু তোমার সংসারে এসে কথা বলতে হচ্ছে।
সুভাষ-কথা তো বলতেই হবে। বোবা এমন কোন সংসার আছে নাকি? আমার জানা নেই।
সু-কথা বাড়িও না। আজ থেকে আমি আর কোন কথা বলবো না।
সুভাষ-খুব ভালো।(সুভাষিনীর ফোনে রিং ফোন ধরে)
সু- কে বলছেন?….……. গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটর থেকে?…… হ্যাঁ বলুন। এই নাও তুমি কথা বল।
সুভাষ- দাও।- হ্যালো,আমি উনার স্বামী বলছি।……… হ্যাঁ হ্যাঁ সুভাষিনী বসু….. কি……কে ওয়াই সি করতে হবে? …. আধার মোবাইল লিংক নেই?…. বাবার নাম নজরুল ইসলাম?…. স্বামীর নাম সুভাষ চন্দ্র বসু ?………দুর মশাই…….গ্যাস পাওয়া যাবে না? (ফোন কেটে গেল) এবার ঠেলা বোঝ।
সু-গ্যাস কোম্পানি গ্যাস দিচ্ছে না তো!
সুভাষ-দিতে পারে নাও দিতে পারে। এবারের এস আই আরে বি এল ওর কাছে কি তথ্য দিয়েছ?
সু-যা জানতে চেয়েছে তাই বলেছি।
সুভাষ- তোমার ওই তোতলামি কাল হয়েছে।
সু-বাবার নাম নজরুল ইসলাম হয় কি করে! স্বামীর নাম না হয় সুভাষ চন্দ্র দাসের জায়গায় সুভাষ চন্দ্র বসু হয়ে গেছে।
সুভাষ-উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে। এবার কি করবে? গ্যাস তো আমার লাগে না ? তোমার লাগে তুমি বুঝবে।
সুভাষিনী-আজ থেকে রান্না খাওয়া বন্ধ থাক।
সুভাষ- এ সব হয় কি করে! তোমার নাম সুভাষিনী বসু, তোমার বাবার নাম সুভাষ চন্দ্র বসু, তোমার স্বামীর নাম সুভাষ চন্দ্র দাস। বাবা স্বামী, স্বামী বাবা। দাসের জায়গায় না হয় বসু হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সুভাষ চন্দ্র বসু্র ঘাড়ে নজরুল ইসলাম চাপবে কেন?
সুভাষিনী- যাও যাও সাইবারে যাও। নাগরিকত্ব হারালাম। ভোট ও দিতে পারবো না খেতে ও পাবো না।
সুভাষ-আগে খাও তারপর ভোট। তোতলা না হয়ে তোমার বোবা হওয়া উচিত ছিল। তোমার আর এ দেশের নাগরিকের কোন অধিকারই থাকলো না।
সুভাষিনী-এবার বাপের দেশেই যাবো। তুমি তোমার এই দেশ নিয়ে থাক।
সুভাষ-সরকার এস আই আর নামে স্বামী স্ত্রী ভাগ করে দেশ ভাগ করতে গেলে মানুষের অনেক দু্ঃখ আছে কপালে।
সুভাষিনী-আমি একটা কবিতা বলবো?
সুভাষ-না, তোমার তোতলামি যদি বন্ধ করতে পার তাহলে আমি কবিতা শুনবো। নইলে তুমি লিখবে আমি পড়বো।
সুভাষিনী-তাহলে বলি-?
সুভাষ-বল।
সুভাষিনী-বলি?
সুভাষ-ব..ল
সু-তুমি পুরুষ আমি নারী ঘর বেঁধেছি দুয়ে মিলে
আদর্শ পরিবার কেমনে হতাম ভুল ত্রুটি না থাকলে
যতই ঝড় আসে আসুক বাধা সরিয়ে যদি না এগোতে পারি
প্রকৃতির সৃষ্টি ব্যর্থ হবে আমরা মানুষ তুমি পুরুষ আমি নারী।
সুভাষ-এইতো । একবার ও আটকাওনি। সুন্দর কবিতা সুন্দর আবৃত্তি। তোমার বাবা সুভাষ চন্দ্র বসুর সুভাষিনী নাম দেওয়া সার্থক। এসো দুজনে বাবাকে স্মরন করে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে প্রনাম করি।
(শেষ)
