ব্যাংক জাতীয়করণ
ভারতে ব্যাংক জাতীয়করণকে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর গৃহীত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনীয়তা ছিল সুদূর প্রসারী
১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত ভারতে ব্যাংকিং পরিষেবা মূলত শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল, যার ফলে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে অঞ্চলগুলো এ ধরনের পরিষেবা থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত ছিল।
এর ফলে কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প এবং কর্মসংস্থানের মতো খাতগুলোর জন্য ব্যাংকিং ও ঋণ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছিল।
ফলে এমন একটি ধারণার সৃষ্টি হয় যে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো কেবল মুনাফা-কেন্দ্রিক এবং সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ নয়; কারণ অধিক ব্যয়ের আশঙ্কায় তারা ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনয়ন থেকে বিরত থাকত।
তাই, পরিকল্পিত উন্নয়নের সাথে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোতে ঋণ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং সম্পদের কেন্দ্রীভবন হ্রাস করার লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালে ব্যাংক জাতীয়করণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
১৯৬৯ সালের ব্যাংক জাতীয়করণ
প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালে ব্যাংক জাতীয়করণের যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কার। এর মাধ্যমে ১৪টি বড় বেসরকারি ব্যাংককে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়, যাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সমাজতান্ত্রিক ও উন্নয়নমূলক লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়।
১৯৫৫ সালে ‘স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া’ জাতীয়করণের মতো পূর্ববর্তী সংস্কারগুলোর ওপর ভিত্তি করেই এই পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল এই খাতটিকে সুসংহত ও নিয়ন্ত্রিত করার মাধ্যমে ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল করে তোলা।
ইতিবাচক প্রভাবসমূহ
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি: গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকায় শাখার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ফলে ব্যাংকিং সেবার প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে ঋণ: কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত বা দুর্বল জনগোষ্ঠী প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সুবিধা পেয়েছে।
সামাজিক সমতা: ব্যাংকিং খাতের ওপর বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য হ্রাস পেয়েছে এবং জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যের সাথে অর্থায়নের সমন্বয় সাধিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা: সবুজ বিপ্লব এবং গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোতে অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
জনগণের আস্থা: রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পেয়েছে।
নেতিবাচক প্রভাবসমূহ
পরিচালনগত অদক্ষতা: সরকারি মালিকানার ফলে এমন এক ‘আমলাতান্ত্রিক’ সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছিল, যার বৈশিষ্ট্য ছিল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা (red-tapism), ধীরগতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং গ্রাহক-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা বা যৌক্তিকতার চেয়ে প্রায়শই রাজনৈতিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেত।
মুনাফা হ্রাসের প্রবণতা: ব্যাংকগুলো মুনাফা অর্জনের পরিবর্তে সামাজিক লক্ষ্য পূরণের দিকে মনোনিবেশ করায় তাদের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বারবার সরকারি মূলধন পুনর্গঠনের (recapitalisation) প্রয়োজন দেখা দেয়।
উদ্ভাবনী শক্তির সংকোচন: প্রতিযোগিতার অভাব প্রযুক্তিগত ও সেবার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে উদ্দীপনা কমিয়ে দেয়।
উপসংহার
১৯৬৯ সালের ব্যাংক জাতীয়করণ ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ সম্প্রসারিত করেছিল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছিল; তবে এর ফলে অদক্ষতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সমস্যাও তৈরি হয়েছিল।
তাই সংস্কারের ক্ষেত্রে শক্তিশালী সুশাসন, ডিজিটাল ব্যাংকিং, আর্থিক সাক্ষরতা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক তদারকির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। একইসাথে, সামাজিক লক্ষ্য ও কর্মদক্ষতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং উন্নত কার্যকারিতার জন্য ব্যাংকের অধিকতর স্বায়ত্তশাসন কিংবা বেসরকারিকরণের বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিৎ।
(তথ্য সংগৃহীত)
