।। প্রয়াত তৃপ্তি মিত্রের জন্ম শতবর্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন।।
সুধাংশু রাউৎ
বছর বছর একশো বছর। জীবিত অবস্থায় সেঞ্চুরি পার করে ক’জন?  মহামানব বা মহামানবীরা একশো বছরের অনেক আগেই পৃথিবীর সব মায়া কাটিয়ে স্বর্গারোহন করেন। জন্ম শতবর্ষে এমন একজনকে স্মরন করবো সেই মহামানবী তৃপ্তি মিত্র।
নাট্য জগতে পদ্মশ্রী পাওয়ার সময়টা সম্ভবত ১৯৭১ সাল। ১৯৭২ এ গ্রাম থেকে শহরে প্রথম কলকাতায় পা রেখেছি বয়স মাত্র পঁচিশ। রেডিও তে নাটক শোনা ও লেখায় পটু বলবো না আগ্রহের সীমা পরিসীমা ছিল না। নাট্যকার হতেই হবে তা আবার বেতার নাটকে। রঙ্গমঞ্চের নাটকের সঙ্গে বেতার নাটকের তফাৎটা ছিল কান আর চোখ। বেতার নাটকের আর এক নাম শ্রুতিনাটক। শুধু কানে শুনে কুশীলবদের কথায় নাটকীয় পরিবেশে ঘটনাস্থল বুঝে নিতে হয়। দরকার উপলব্ধি। উপলব্ধি স্রোতা ও লেখকের।
এগারো নম্বর ষ্টুডিওয় একটা এল পি ডিস্ক চালিয়ে ক্ষৌনীশ বাগচী সাহেব জগন্নাথ দার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শুক্লা বন্দ্যোপাধ্যায়, অজিত মুখোপাধ্যায়, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়, আর ছিলেন তৃপ্তি মিত্র । পরিচয় শেষে জগন্নাথ দা বলেছিলেন -‘গ্রামের যাত্রা নাটক লেখ কাজ দেবে ‘। শুক্লা দি বলেছিলেন -‘ নাকে গালে ফোঁড়া কেন?’ তৃপ্তি দি বলেছিলেন -‘বেশী আম খাওয়া হচ্ছে বোধ হয়’। আমি একটা কথা বলিনি সেদিন। মনে হয়েছিল এসব কথা কি অপমানজনক নাকি সম্মানজনক নাকি উপলব্ধির পরীক্ষা! পরীক্ষায় পাস করেছিলাম। আকাশবাণীর চিঠি পেয়ে সমস্ত দূর্ভাবনার অন্ত হয়েছিল। আমার নিজের কথা বেশী বাড়িয়ে নাটক করতে চাই না, প্রসঙ্গ তৃপ্তি মিত্র।
চার দশক ধরে বাংলা নাটক বা সিনেমায় তখনকার দিনে নাম ভূমিকায় তৃপ্তি মিত্র ছিলেন অদ্বিতীয়। শম্ভু মিত্রের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে নাট্যজুটি রঙ্গমঞ্চ কাঁপিয়েছেন। আজ তাঁর জন্ম শতবর্ষে শ্রদ্ধা ও প্রনাম জানাই। সংগৃহীত কিছু তথ্য এখানে উল্লেখ করলাম।
তৃপ্তি মিত্র ২৫ অক্টোবর, ১৯২৫ ঠাকুরগাঁয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আশুতোষ ভাদুড়ী এবং মাতার নাম শৈলবালা দেবী। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে শম্ভু মিত্রের সাথে তার বিয়ে হয়। তার কন্যা শাঁওলি মিত্র একজন অভিনেত্রী।
১৯৪৮ সালে শম্ভু মিত্র এবং তৃপ্তি মিত্র তাদের নিজেদের নাট্যদল বহুরূপী প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯৫৯ সালে ঢাকায় “জাগো হুয়া সাভেরা” নামের উর্দু সিনেমায় অভিনয় করেন যেটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝির উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়। তিনি ৬৪ বছর  বয়সে ১৯৮৯ সালের ২৪ মে মৃত্যুবরণ করেন।
দশের ওপরে সিনেমা, রঙ্গমঞ্চে প্রায় পনেরোর ওপরে অভিনয় করেন।
যুক্তি তক্কো আর গপ্পো ঋত্বিক ঘটক এর পরিচালিত একটি চলচ্চিত্র। এই ছবিটির কাজ শুরু হয় ১৯৭৪ সালে এবং শেষ হবার পরে ছবিটি মুক্তিপ্রাপ্ত হয় ১৯৭৭ সালে। এই ছবিটি-ই ঋত্বিক ঘটক–এর শেষ ছবি। এই ছবিটিকে অনেকে ঘটক এর আত্মজীবনীমূলক ছবি বলে বিবেচনা করেন।
যুক্তি তক্ক আর গপ্পোর কাহিনী যতদূর মনে পড়ে –
শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী অথচ মাতাল নীলকণ্ঠকে মাঝ বয়সে স্ত্রী’র সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদে যেতে হয়। স্ত্রী, সন্তান আর কলকাতার গলিপথ ছেড়ে সে বেরিয়ে পড়ে। তার সঙ্গী হয় পাড়ার তরুণ নচিকেতা। দুজনের যাত্রা শুরু হয় অজানার উদ্দেশ্যে। পথে পরিচয় হয় বঙ্গবালা’র সঙ্গে। ১৯৭১-এর ৩০ মার্চ বাংলাদেশে পাকিস্তানি মিলিটারির বর্বরতার শিকার সে। তার সঙ্গে আছে টোলের পণ্ডিত। কলকাতায় তারা এসেছেন জীবন ও জীবিকার আশায়। এই চারজন এক সাথে পথ চলা শুরু করে। এক সময় তারা এসে পৌঁছায় পুরুলিয়ায়। ছৌ নাচের শিল্পীদের সঙ্গে সেখানে ভূমি দখলদারদের লড়াই চলছে। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে গুলিতে নিহত হয় পণ্ডিত। এরপর তারা তিনজন যায় বীরভূমে, সেখানে তার স্ত্রীকে সে অনুরোধ করে, কাল সকালে ছেলেকে একটু দেখতে দেয়ার জন্য শালবনে পাঠাতে। বনের ভেতরে নীলকণ্ঠ মুখোমুখি হয় বিদ্রোহী নকশালদের। সশস্ত্র নকশালদের সঙ্গে পুলিশের বন্দুক যুদ্ধ হয়। গোলাগুলি শেষ হয়। এ সময় নীলকণ্ঠের ছেলে এসে পিতাকে ডাকে। তার ডাক শুনে পুলিশ আবার গুলি করে। নীলকণ্ঠ মারা যায়।
তৃপ্তি মিত্র তিনটি শ্রেষ্ঠ সম্মান পুরস্কারে ভূষিত হন।
সংগীত নাটক একাডেমী পুরস্কার ১৯৬২,পদ্মশ্রী ১৯৭১,মধ্যপ্রদেশ সরকার কর্তৃক কালিদাস সম্মান ১৯৮৯ ।
তথ্যসূত্র
অজয় কুমার রায় (আগস্ট ২০১৮)। “রাজনৈতিক ও গুণী ব্যক্তিদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি”। ঠাকুরগাঁও জেলার ইতিহাস (২ সংস্করণ)। ঢাকা: টাঙ্গন প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন। পৃ. ২৫১। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৮৪৩৪৪৬৪৯৭। {{বই উদ্ধৃতি}}: |সংগ্রহের-তারিখ= এর জন্য |ইউআরএল= প্রয়োজন (সাহায্য)
“তৃপ্তি মিত্র Gomolo Article”। Gomolo। ৩ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৬ মার্চ ২০১২।
“বহুরূপী” ২ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৮ মার্চ ২০১২।
ইন্টারনেট মুভি ডেটাবেজে তৃপ্তি ভাদুড়ী (ইংরেজি)
“SNA: List of Akademi Awardees”। Sangeet Natak Akademi Official website। ২৭ জুলাই ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০১৩।
“Padma Awards Directory (1954-2009)” (পিডিএফ)। Ministry of Home Affairs। ১০ মে ২০১৩ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০১৩।
“Kalidas Award Holders (Theatre)”। Department of Culture, Government of Madhya Pradesh। ২০ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০১৩
ইন্টারনেট মুভি ডেটাবেসে তৃপ্তি মিত্র (ইংরেজি)
সলিল কুমার মুখার্জী দ্বারা ৩ মাস আগে সর্বশেষ তথ্য সংগৃহীত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *