মহাকুম্ভ -২০২৫ (ভাগ-১)

এই নিবন্ধটি ভারতের মহাকুম্ভ অনুষ্ঠান সম্পর্কে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক মহাকুম্ভ অনুষ্ঠান ২০২৫ প্রয়াগ আমার চোখে দেখা আমার লেখায় হাল হকিকত দেখুন।কুম্ভমেলা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থযাত্রা, যা প্রতি ৩, ৬, ১২ এবং ১৪৪ বছরে একবার পালিত হয়। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সমাবেশ হিসেবে পরিচিত মেলাটি চারটি তীর্থস্থানে অনুষ্ঠিত হয়:এই বছর ২০২৫ প্রয়াগরাজ (যেখানে গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতী নদীর মিলন। এলাহাবাদের ত্রিবেণী সঙ্গমে), হরিদ্বারে (গঙ্গা নদী), নাসিকে (গোদাবরী নদী) এবং উজ্জয়িনীতে (শিপ্রা নদী)।আমরা প্রয়াগরাজে মহাকুম্ভে যাওয়ার জন্য ২৬ জানুয়ারী ২০২৫ আমার ভাইর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এলাহাবাদ ব্যাংকে চাকরী করেছি ৩৬ বছর। অবসর নিয়ে এলাহাবাদে মহাকুম্ভ দেখবো না তাই আবার হয় নাকি। ভাই ইনকাম ট্যাক্সের কর্মী হওয়ার কারণে গাড়ীতে একটি govt.of India বোর্ড লাগানো ছিল। প্রবীণ নাগরিকের তকমা আবার সরকারি ভাবে যতটুকু সুযোগ সুবিধা নেওয়া সবটাই আমার মহা কুম্ভ যাত্রার অনুকূলে ছিল। এদিকে আবার আমার ড্রাইভার সুদীপ জানার মা সত্তরোর্ধ বিধবা আমার স্ত্রীর সঙ্গী হলেন। নিশ্চিন্ত মনে সুদীপের সাহসী ও দক্ষতায় গাড়ী চালানোর ভরসায় কাঁথি থেকে রওনা দিলাম। দুরে দুরে গাড়ি নিয়ে ভ্রমনের অভিজ্ঞতা আমার আমার আছে। ১২ বছর আগে গাড়ি নিয়ে বাবা মায়ের শ্রাদ্ধ দিতে আমি ও ভাই রবীন্দ্রনাথ গাড়ি নিয়ে শোলের রামগড় বন্ধুর পাহাড়ী পথে গয়া গিয়েছি। তখন এন্ড্রয়েড মোবাইল না থাকায় কম্পিউটারে গুগল সার্চ করে প্রিন্ট আউট নিয়ে গয়া গিয়েছি। তাছাড়া ও বার বার মধ্যপ্রদেশ (ছত্তিশগড়) গাড়ি নিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে।ভয়ের উল্টো সাহসটাই আমার বল্। সকাল ৬টায় রওনা দিলাম। ঠান্ডা ছিলনা বললেই চলে। আমার একটি বদভ্যাস আছে যা অন্য কারো নেই। দুপুরের দিকে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নদীতে চান করা তারপর খাওয়া। শরীর ঘরে থাকার মতন আনন্দ অনুভব করে। মোবাইলে গুগল ম্যাপ সেট করে পথ চলা।ক্যাশিয়াড়ি বহড়াগোড়া বেল পাহাড়ী পুরুলিয়া তোপচাঁচিতে জিটি রোড ধরে গয়া বেনারস প্রয়াগ কুম্ভ । আমাদের গ্রামের মেয়ে আরতী বেরা। বেনারসে আরতী বেরার শ্বশুর বাড়ি রাম দাস প্রজাপতি তার স্বামীর নাম। বেনারসে ঠেলায় সব্জি বেচে সংসার চলে। ২৬ শে জানুয়ারী সারাদিন সারারাত গাড়ি চালিয়ে বেনারসের পাঁচকোশীতে পৌঁছালাম রাত তিনটায়।কাশী বিশ্বনাথ মন্দির থেকে দুরত্ব মাত্র আড়াই কিলোমিটার। ছোট এক শহরতলী এই পাঁচকোষী । তবে ঘিঞ্জি এলাকা ছোট ছোট পরিবার এখানে বাস করে। বেনারস রাত্রে একেবারে জনশূন্য। ফোনে কথা হতেই সব্জি মন্ডির চৌরাস্তার মোড় থেকে রামবাস প্রজাপতি আমাদের নিয়ে গেল । খুবই ক্লান্ত শরীর রেডিবেডে শুয়ে পড়লাম। কনকনে ঠান্ডায় একবারে জমে গেলাম। কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়তেই সকাল ৮টা।

মহাকুম্ভ -২০২৫ (ভাগ-২)গতকাল ৮৫০ কিলোমিটার এক নাগাড়ে জার্নির পর শরীর তো অভিমান করবেই।২৭ শে জানুয়ারী সকাল আটটায় ঘুম ভাঙ্গতেই চা জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম প্রয়াগের উদ্দেশ্যে। প্রয়াগের ১নং ঘাট পর্যন্ত যেতে ১০০ কিলোমিটার। ৮০ কিলোমিটার, বাকী ২০ কিলোমিটার পায়দল। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালেন আমার দিদি, অর্থাৎ আমার বয়সী চঞ্চলা নুটু্র(ড্রাইভারের) মা। তার সেই জেদ ২৯ বুধবার সকাল ৯টায় মৌনি অমাবস্যার দিন শাহি স্নানের সময় তাঁকে দেখতে হবে ও ডুব দিতে হবে নদী সঙ্গম স্থলে। আমি অনেক বোঝালাম। নিউজ দেখালাম, জি টি রোড বন্ধ , সেখানে থাকার জায়গা নেই,কয়েক কোটি নাগা সাধু মিলে ১০,১৫ দিন আগে থেকে সেখানে রাস্তাঘাটে বনবাদাড়ে পড়ে আছে। আপনি কত পাপ করেছেন যে সেই দিনই স্নান সেরে পুন্য অর্জন করতে হবে? মহাকুম্ভে স্নান করলে পুন্য অর্জন হয়না প্রান বিসর্জন হয়।খুব কঠিন আশাও জবাব- নজরুলের দু চারটি শব্দ ‘দুলিতেছে তরী ফুলিতেছে জল দুস্তর পারাবার’ – বয়ে গেছে – মৃত্যু কে আলিঙ্গন করবো আবার ভয় ও করবো ! চঞ্চলার জবাব “মরবো তো মরবো কুম্ভে মরবো ওই দিনই মরবো।”সমর্থন জানিয়ে ২৯ তারিখ ভোর ৪ টায় বেরোবার সিদ্ধান্ত নিলাম।২৭ তারিখ সোমবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সারনাথের উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার। সারনাথের শিল্পকলা সত্যিই অনবদ্য ।সারনাথ হল একটি বিশিষ্ট বৌদ্ধ এবং জৈন তীর্থস্থান যা বারাণসীর কাছে গঙ্গা ও বরুণা নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। এখানে, বুদ্ধ তার প্রথম ধর্মোপদেশ দেন এবং প্রথম বৌদ্ধ সংঘ গঠন করেন। ২/৩ ঘন্টা ঘোরাঘুরির পর দুপুর ২টা নাগাদ আশ্রয় স্থলে ফিরে খেয়ে দেয়ে গতদিনের বাকী ঘুম সারলাম। সন্ধ্যায় বাজারের দিকে বেরিয়ে পাঁচকোষী মার্কেট ও আশপাশের ভৌগোলিক অবস্থান ও ওখানকার মানুষদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম ভিন গাঁ থেকে আসা মানুষের সংখ্যা বেশী।পরের দিন ২৮ মঙ্গলবার বাবা বিশ্বনাথ দর্শন ও গঙ্গার ঘাটে আরতীকে নিয়ে সন্ধ্যা আরতী দেখা হবে সিদ্ধান্ত হলো।২৭ রাত কাটলো খুব আনন্দে হাসি ঠাট্টা গল্পে। যার বাড়িতে আছি তার নাম আরতী বেরা তার বাপের বাড়ি কাঁথিতে। খুব সুন্দর যোগাযোগ। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারিনি। সে যে কাঁথির মেয়ে জেনে অবাক হলাম। তার কথা শুনে কেউ বলতে পারবে না যে সে কাঁথির। রাম বাস আজমগড়ের মানুষ এই বারানসির তীর্থস্থানই তাদের মিলনক্ষেত্র। আর্তির বয়স ৫৫ রাম বাসের বয়স ৬২ । রাম বাসের মুখে আর্তি ডাক শুনে আমি কিছুতেই বুঝতে পারিনি যে সে বারানসির আর্তি কাঁথির আরতী। এই ভাগ এখানেই শেষ।(প্রত্যেকেই স্ক্রিনে টাচ্ করে আমার ইউটিউবে ঢুকে যাবেন সম্পূর্ন ভিডিও টি দেখলে আমার কষ্ট সার্থক হবে। কেন কি এই সুযোগ কারো জীবনে আর আসবে না।)

মহাক্কুম্ভ -২০২৫ (ভাগ-৩)২৮ জানুয়ারী মঙ্গলবার সিদ্ধান্ত হলো যে দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে বেরিয়ে বাবা বিশ্বনাথ দর্শন ও গঙ্গার ঘাটে আরতী দেখে ফিরবো। গাড়ি নিয়ে যাওয়া ভালো আর্তি বললো মন্দিরের সামনে রেখে ঠাকুর মন্দিরের গলিতে ঢুকে ঠাকুর দর্শন করে সন্ধ্যা পাঁচটায় নৌকায় চড়ে আরতী দেখে আবার গাড়ির কাছে ফিরে আসবো। খুবই সহজ ব্যাপার। আমি শুধু জানতে চাইলাম ‘মন্দিরের কাছে পার্কিং আছে তো।’ সবজান্তার মত খানিক চুপ থেকে যা বললো -‘তুমি বেনারসে কদিন আছ কি জান ? কাক চরিত্র তুমি বুঝবে কি?’আর কিছু বললাম না ভাবলাম কাকই বটে। আরতী এত বাড়ুয়া নো এন্ট্রি সম্পর্কে তার যে কোনো ধারণাই নেই সে বুঝে গেলাম। অতঃপর গাড়ি নিয়েই বেরোলাম। গুগলই সহায়। সামান্য দু আড়াই কিলোমিটার রাস্তা । মন্দিরের গেটে যেতে গুগল বলে এক রাস্তা আরতী বলে অন্য রাস্তা। বাবুগো মন্দিরের পথে ঢুকেতো পড়লাম। ওইখানেই চারবার চক্কর দিয়ে কোনো পার্কিং পেলাম না। পুলিশ কে জিজ্ঞেস করলেই। ‘উধার যাইয়ে’ মনে ভাবছি উধার কিধার! উধার বলছে না উপর বলছে। হায় ভগবান বিশ্বনাথ পার কর। পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ কোন দিক! সবদিকতো চারবার হলো উপরই হবে।নুটুকে বললাম পুলিশ যে রাস্তায় যেতে বলছে সেই রাস্তায় চল। সম্ভবতঃ পুলিশ গাড়ী নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে বলছে। আর্তির কথায় কান না দিয়ে নুটু বড় রাস্তায় সোজা বেরিয়ে গেল। যাবি তো যা ঘরের রাস্তার উল্টো দিকে চার পাঁচ কিলোমিটার। ঘরে ফিরে যেতে প্রায় ১৪/১৫ কিলোমিটার গাড়িকে ধড়ধড়া গোবিন্দপুর দিয়ে ঘুরতে হবে। মন্দিরের কাছে এসেও আমাদের পাঁচ কিলোমিটার দূরে নামতে হলো। নুটু আমাদের কে নামিয়ে দিয়ে বললো ‘আপনারা মন্দিরের কাছে রাজঘাটে দাঁড়াবেন আমি গাড়ি ঘরে রেখে আসছি।’ সে একটা ওষুধ দোকানের সামনে নামিয়ে দিল। আমি ওষুধ দোকানের একজনের সঙ্গে আলোচনা করে বুঝলাম। কুম্ভর গাড়ি গুলোকে জিটি রোডে আটকে দেওয়ায় এরা বেনারসে ঢুকে এই বিপত্তি। বেনারসে তিল ধারণের জায়গা নেই। সব বিশ্বনাথ মন্দিরেই আশ্রয়ের আশায় দলে দলে ঢুকে পড়ছে। আরতী অনেকটাই জব্দ হয়েছে। মোটামুটি বিশ্বনাথ কে দর্শন করা যাবে আশা মনে। চারটা বেজে গেছে। প্রায় দু কিলোমিটার বাকী মন্দিরে যেতে। দেখি লাইনে ঠেলাঠেলি চলছে। পুলিশ লাইন সামলাতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। এটা নাকি মন্দিরে ঢোকার লাইন। আর্তিকে বললাম ‘তুমি কোন সোজা পথে ঘাটে নিয়ে চল। ঠাকুর আর দেখবোনা। একটা ছবি কিনে প্রনাম করে নেবো’ আর্তি বললো ‘দাদা রাজঘাটে আরতী দেখতে হলে দু কিলোমিটার মানুষ ঠেলে অলিতে গলিতে যেতে হবে।’ শেষমেষ অলিগলি করে রাজঘাটে পৌঁছালাম সাড়ে পাঁচটায়। তাও আরতী যেখানে হয় প্রায় এক কিলোমিটার কিছু দেখতে পাবো বলে মনে হচ্ছে না, ছবি তুলে লোককে দেখাবো কি?নুটু এসে গেছে লঞ্চে ভি আইপি দোতলায় ২০০ টাকা কয়েকটি সিট নিয়ে লঞ্চে উঠে পড়লাম। লঞ্চ সেই অনেক দুর থেকে ঘুরিয়ে দেখালো। জয় বাবা বিশ্বনাথ। লঞ্চ থেকে চিৎকার ‘হর হর মহাদেব মা গঙ্গে’ হেঁটে আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার ভীড় ঠেলে ডেরায় ফিরলাম। আমার একটু খারাপ অভ্যাস রেগে খারাপ কিছু বলে ফেলা। তা আমার স্ত্রী আমাকে সতর্ক করলো “তুমি আর্তি কে কিছু বলবেনা।” রাগে কার কথা কে শোনে। আর্তিকে বললাম”তোমার লেখাপড়া না থাকলে ও তোমার অনেক জ্ঞান ও বুদ্ধি আছে।” ২৮ শেষ ।

মহা কুম্ভ -২০২৫ (ভাগ-৪)২৯ জানুয়ারী ভোর চারটায় তৈরী হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। জিটি রোড যতই জ্যাম থাকুক না কেন ৯ টার মধ্যে ৬০ কিলোমিটার অনায়াসে পৌঁছে যাবো বাকী ১৭ কিলোমিটার পায়ে হাঁটা পথ প্রয়াগের সঙ্গম ঘাট পর্যন্ত। সবাইকে নামিয়ে দিলে যে স্নান ঘাটে যেতে পারবে সে যাবে। আমার কোন স্নানের ইচ্ছা নেই। চঞ্চলা বুড়ি কি করে তাই দেখার। আমি তো রোজই টিভি চ্যানেল গুলো সার্চ করে দেখছি। এইবার নিজে খবর হবো না খবর করবো সেই ভাবনায় আছি। যাই হোক গুগল মেরে গাড়ি ছেড়ে দিলাম। রাস্তা ফাঁকা ভেবেছিলাম ফাঁকা নেই। ২ কিলোমিটার জিটি রোডের দিকে এগোতেই পুলিশ আটকে দিল। এলাহাবাদের দিকে একটা রাস্তায় ঘুরে যেতে বললো। গুগলে দেখলাম সেই রাস্তা অযোধ্যা রামমন্দির হয়ে প্রয়াগ গেছে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বাইচার। প্রশাসনিক ব্যবস্থা মানতেই হবে। গাড়ি ছুটলো , প্রায় ৫০ কিলোমিটার যাওয়ার পর এক চৌরাস্তা ক্রসিং গুগল দেখাচ্ছে ওখান থেকে বাঁদিকে ৩০ কিলোমিটার গেলে প্রয়াগ সংলগ্ন গঙ্গার ঘাট। তখন সময় সকাল ৮টা। গাড়ি সাইট করে নেমে পড়লাম। দেখলাম সামনে পিছনে শুধু গাড়ি আর গাড়ি বাস ছোট ছোট গাড়িতে রাস্তা জ্যাম। আমরা বাঁদিকে একটু ছোট রাস্তার লাগোয়া একটি চা দোকানের কাছে গাড়ি রেখে চা দোকানে একটু খবর নেওয়া ও চা খাওয়া। চা দোকানে এত ভীড় যে চা পাওয়া ও দুষ্কর। বছর ছয় সাতেক নুটুর মেয়ে পাঁউরুটি খুঁজে চলেছে। কি করা যায় দু একজনের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম। এসব প্রশাসনিক কৌশল। কাউকেই আর প্রয়াগে যেতে দেওয়া হবে না। গা শিউরে উঠল। একটি হিমাচলের বাস দেখে জানার আগ্রহ নিয়ে বাসের উল্টোদিকে সামান্য খোলা জানলার ধারে বসা বুড়ীকে হাত ঢুকিয়ে ঠেলা দিতেই ঘটলো এক কান্ড। আমরা তো মাত্র ৫০ কিলোমিটার এসেছি, না যেতে দিলে বয়ে যায়, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাবো। বাসের ড্রাইভার সীটে ড্রাইভার নেই। বাসের সীটে বসা প্রায় ৫০/৬০জন যাত্রী মৃতপ্রায় অবস্থা। ড্রাইভার কে চা দোকানে খুঁজে বার করলাম। তাকে জানালাম ঘটনাটা। তার কথা শুনে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। ড্রাইভারের উক্তি শুনে থ হয়ে গেলাম। সে যা বললো তারই কথাটা তুলে ধরছি ” আপকো কেয়া তকলিব হ্যায় ? ও লোগকো মরনে দিজিয়ে। চার দিন সে রাস্তামে হ্যায়। খানা পানি নেহী।”বুঝলাম মরা মানুষকে নিয়ে এরা মহাকুম্ভ যাচ্ছে। আর এইসব না দেখে না বুঝে সামনে পুলিশের কাছে গিয়ে govt of india বলে সাহায্য চাইলাম। একজন পুলিশ আমাদের রাস্তা দেখিয়ে দিল সেই রাস্তায় প্রয়াগের একটি গঙ্গা ঘাট পাওয়া যাবে। তাড়াতাড়ি সেখান থেকে ছোট রাস্তা ধরে ৪০ কিলোমিটার যেতেই একটা ঘাট পাওয়া গেল। গুগল দেখাচ্ছিল প্রয়াগ ও বেনারসের মধ্যবর্তী একটি গঙ্গার ঘাট। চঞ্চলা সেই ঘাটৈ ডুব দিয়ে কিছু পুন্য তো পেলো! আবার সেই রাস্তায় ফিরতে মন চাইল না। যে বুড়ীর কাছে জানতে চেয়ে ঠেলা দিয়েছিলাম,সে যখন গড়িয়ে পড়লো আমি সিওর যে সে মারা গেছে। তাই মোবাইল দেখে স্নান সেরে ৩০ কিলোমিটার আর একটি গ্রাম্য রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে ডেরায় ফিরলাম দুপুর ২টা। পরে জানলাম মহাকুম্ভ মেলায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার নিখোঁজ। আমার কাঁথির চারজন নিখোঁজের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে কোন ডেথ সার্টিফিকেট পুলিশ দেয়নি। বাকী নিখোঁজেরা বেঁচে আছে এই গ্যারান্টি কে দেবে? মহা কুম্ভের এই অসমাপ্ত যাত্রা সমাপ্ত হলো আর্তির ঘরে।

মহাকুম্ভ -২০২৫ (ভাগ-৫)৩০ জানুয়ারী ভোর চারটায় ঘরের দিকে রওনা দিলাম। ৪.৩০ জিটি ধরে আসছি। রাত ১০টায় কাঁথির ঘরে পৌছে যাওয়ার কথা। বিপত্তি ঘটলো মোঘলসরাইতে ওখানে একটা প্রাইভেট কার গার্ড ওয়ালে ধাক্কা খেয়ে আগুন লেগে গেছে। রাস্তা জ্যাম, নামা দেখা ছবি তোলা কোনো ইচ্ছাই নেই। দুদিকে বিশাল দোতলা বাড়ি সমান লরি গুলো তাদের কত চাকা জানা নেই সব সারে সারে দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে ডাউন লাইনে ছোট ছোট গাড়ি ফোর লেনের মাঝখানের কাটিং দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আপ ডাউন রাস্তা যদি ব্লক হয়ে যায় গাড়ি ডাউন লাইনে বেরোবে কি করে। নুটু এই কাজটি করবে ভাবছিল আমি করতে দিলাম না। একটু একটু দুহাত করে গাড়ি সরছে। সামনের একটা লরি স্টার্ট দিয়েছে। সামনের একটা কারকে ধাক্কা, কাঁচ ভেঙ্গে মিছরি দানা হয়ে ঝরে পড়লো। লরির ড্রাইভারকে মার মার শব্দ। প্রায় ছোট গাড়ি বা বাস WB, মাঝে মাঝে JH,OD আছে। ক্ষিপ্ত WB যুদ্ধংদেহী। নুটু সুযোগ বুঝে ক্রস করে ১০ হাত এগিয়ে থাকলো। সম্ভবতঃ এই জ্যাম গোটা জিটি রোডটাই ছিল। আরো অনেক ঘটনা সব বলা যাবেনা। গয়া এলাম সন্ধ্যা ৬টা। ১৪ ঘন্টায় মাত্র ২৫৭ কিলোমিটার এসেছি আরো ৬০০ কিলোমিটার বাকী পথ আসতে হবে। এর আগে প্রায় ১২/১৪ বছর আগে বাড়ী থেকে গয়া গিয়েছি গাড়ি নিয়ে। খুব খারাপ রাস্তা ছিল। মাথায় ঘুরছে জিটি রোড বাঁয়ে রেখে চম্পারন থেকে হাজারিবাগ ঢুকলে ৬৯ কিলোমিটার রাস্তা ওখানকার হোটেলে আজ রাত কাটিয়ে ৩১ জানুয়ারী অযোধ্যা পাহাড় দেখে বাড়ি ফেরা যাবে। এই জ্যাম আর সহ্য হচ্ছে না। যেই ভাবা সেই কাজ। গাড়ি চম্পারন থেকে হাজারিবাগের দিকে ঢুকিয়ে রাতে হাজারীবাগের হোটেলে থেকে পরের দিন রামগড় হয়ে বেগুন কোদর দেখে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় দেখে রাত দশটায় বাড়ি ফিরলাম।সবই মহাকুম্ভর দৌলতে। ১৪৪ আর আসবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *