ভ্রমণ পিপাসু মনের মানুষরা বোধ হয় বেশিদিন বাঁচে। আমরা সবাই জানি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য গ্রহণকারী মানুষ কে ক্লেদ গ্লানি হতাশা কোন উপসর্গ কোনোদিনই ছুঁতে পারে না।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি মহকুমার লোক আমি। এই জেলার দেখা অদেখা পর্যটন কেন্দ্রগুলি সম্পর্কে ঠিক ঠিক করে না জানালে অতুক্তি হবে। ভ্রমণ আড্ডার বিপ্লব বসুর ফোন পেয়ে চলে গেলাম তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরে সঠিক তথ্য সংগ্রহের ইচ্ছা নিয়ে।
তমলুক পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অন্যতম জেলা শহর। এই তমলুকের ঐতিহাসিক নাম তাম্রলিপ্ত। অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলাকে ২০০২ সালে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। পশ্চিম মেদিনীপুর ও পূর্ব মেদিনীপুর।
এই জেলার আয়তন ৪২৯৫ বর্গ কিলোমিটার। ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের জন্য পূর্ব মেদিনীপুরের সমুদ্র তীরবর্তী পর্যটন কেন্দ্রগুলিই সর্বোৎকৃষ্ট। দীঘা, শংকরপুর, মান্দারমনি, শৌলা, জুনপুট, বাঁকিপুট, দারিয়াপুর, কপালকুণ্ডলা, পেটুয়াঘাট, হিজলী, রসলপুর ঘাট, হলদিয়া ইত্যাদি।
মানুষের মনে সাগরের প্রতি একটা আলাদা অনুভূতি আছে। সেই আকর্ষণে শহর গ্রাম থেকে দিবারাত্রি মানুষ ছুটছে সমুদ্র উপকূলে। সত্যি বলতে কি যেন পুকুর ঘাট হয়ে গেছে। হাওড়ায় ট্রেনে অথবা বাসে চাপলে তিন চার ঘণ্টায় দীঘা। সারাদিন ঘুরে আবার রাত্রে ঘরে ফিরে যাওয়া। হাওড়া ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মাঝামাঝি কোলাঘাট ব্রিজ দুই জেলাকে জুড়েছে। আবার রূপনারায়ণ নদী দুই জেলাকে ভাগ করেছে। কোলাঘাটে নদীর তীরে খুব সুন্দর পিকনিক স্পট ও নৌকায় চেপে নৌকা বিহার অনির্বচনীয় এক সুখের আবেশ তৈরী করে। সূর্যাস্তের ঠিক আগে রূপনারায়ণ নদীর বুকে প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যের খেলা আমাদের মন কাড়ে।
কোলাঘাট পেরিয়ে মেছেদা হয়ে তমলুকে প্রবেশ করতে হয়। তমলুক শহরে আসার আর একটি পথ আছে। কোলকাতা থেকে বাসে ডায়মন্ডহারবার বা রায়চক। তারপর লঞ্চে নদী পেরিয়ে কুঁকড়াহাটি। এই পথে তমলুক আসা অনেক বেশি সুখদায়ক এক ঘণ্টা সময় হয়তো বেশী লাগবে তাহলে ও আনন্দটা আরো অনেক বেশী।
কুঁকড়াহাটি থেকে সরাসরি তমলুক না এসে হলদিয়া বাসে চড়ে বসলেই হলদিয়া বন্দর সারাদিন দেখে ঠিক বিকেল তিনটায় মহিশাদলের রাজবাড়ী পৌঁছে যাওয়া যাবে। মহিশাদলের রাজবাড়ী এক ঐতিহাসিক দলিল। এক দু ঘন্টা ঘুরে দেখে নিয়ে সোজা বাসে তমলুক। তমলুকে অনেক হোটেল লজ আছে ওখানেই রাত্রিবাস। পরদিন সকাল সকাল স্নান সেরে বর্গভীমা মন্দিরে পৌঁছে যেতে হবে।
মা বর্গভীমা সম্পর্কে পৌরাণিক কাহিনী জেনে রাখা ভালো তাই সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিলাম।
কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর চণ্ডীমঙ্গল (অভয়ামঙ্গল) কাব্যে এই বর্গভীমা দেবী সম্পর্কে লিখেছেন ।
‘গোকুলে গোমতীনামা তাম্রলিপ্তে বর্গভীমা উত্তরে বিদিত বিশ্বকায়া।’
এটি প্রায় চারশ বছর আগের লেখা।
বর্তমানে মন্দিরটির চারদিকে কিছু সংস্কার করা হলেও মুল প্রাচীন রূপটি অক্ষুণ্ণ। মন্দিরটি উচ্চতায় প্রায় ৬০ ফুট। এর দেওয়ালের ভেতরের প্রস্থ ৯ ফুট। এটি গোল ছাদ বিশিষ্ট। মন্দিরের চারটি অংশ—মূলমন্দির, জগমোহন, যজ্ঞ মন্দির, নাট মন্দির। মন্দিরটির সব অংশ একসঙ্গে তৈরি হয়নি। মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেলীতে ২৭ টি পোড়ামাটির বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি রয়েছে। এ মন্দির রেখা দেউল রীতির। এখনকার রূপ বিশ্লেষণ করলে মনে হয় দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতাব্দীর কোনো এক সময় এ মন্দির নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে এ মন্দিরের অনেক সংস্কার করা হয়েছে। বাইরের টেরাকোটার মূর্তিগুলি সিঁদুরে লেপটে গেছে। মুল দেবী মূর্তি ও মুখোশ পরানোর ফলে আজ আর স্পষ্ট দেখা যায় না।
দুর্গাপুজার সময় মহাধুমধাম সহকারে ষোড়শপচারে পুজা করা হয়। মহাষ্টমীর লগ্নে বলিও দেওয়া হয়। বাইরের হাড়ি কাঠে লাল সিঁদুরের গভীর প্রলেপ রয়েছে। প্রতিদিন প্রহরে প্রহরে ভোগ দেওয়া হয়। এছাড়া বিবাহ অন্নপ্রাশন উপনয়ন এই সব বাঙালি অনুষ্ঠান এই মন্দিরে হয় মহাসমারোহে। কালীপুজোর দিন দেবীমূর্তি রাজবেশে সাজিয়ে বিশেষ পুজো করা হয়। মন্দিরের সেবাইত অরুণ অধিকারী জানান, উগ্রতারা রূপে বর্গভীমার পুজো হয় এবং দেওয়া হয় শোলমাছের ভোগ।
তমলুক শহরের আরাধ্য দেবী মা বর্গভীমা। যে কোনও পুজোর আগে মা বর্গভীমাকে পুজো দিয়ে থাকেন তমলুকের বাসিন্দারা। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা সদর ঐতিহাসিক শহর তাম্রলিপ্ত বা তমলুকের আজও মধ্যমণি মা বর্গভীমা। কয়েক হাজার বছর ধরে শক্তি স্বরূপিণী আদ্যাশক্তি মহামায়া রূপে দেবী বর্গভীমার আরাধনা চলে আসছে। মতান্তরে তিনি ভীমরূপা বা ভৈরব কপালী নামেও পরিচিত। অতীতের প্রায় সব কিছুই ধ্বংসের মুখে চলে গেলেও স্বমহিমায় আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে এই সুবিশাল মন্দির। কালীপুজোয় এই মন্দিরে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। ফলে ভক্ত সমাগমও প্রচুর হয়। মন্দির কমিটির সম্পাদক শিবাজি অধিকারীর মুখে শুনেছি , “যুগ যুগ ধরে তমলুকের অধিষ্ঠাত্রীদেবী রূপে মা পূজিত হয়ে আসছেন। অতীতে এই তল্লাটে কোনও শক্তিপুজোর চল ছিল না। পরবর্তীতে জেলায় শক্তিপুজোর চল শুরু হয়। এখনও সমস্ত শক্তিপুজো শুরুর অনুমতি নিতে হয় দেবী বর্গভীমার কাছ থেকে।”
নৈহাটির ২১ ফুট উচ্চতার কালীমূর্তি বড়মা হিসেবে পূজিতা, দেশ ছাড়িয়ে বিদেশ থেকেও আসে ভক্তরা। ওড়িশি স্থাপত্যের আদলে বর্গভীমা মায়ের মন্দিরের দেউল। উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট। মন্দিরের দেওয়ালে টেরাকোটার অজস্র কাজ। তার মধ্যেই মন্দিরের গর্ভগৃহে কালো পাথরে তৈরি মায়ের মূর্তি বিরাজ করছে দেবী উগ্রতারা রূপে। পুরাণে উল্লেখ রয়েছে, দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের পর বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে খণ্ডিত হয় তাঁর বাম পায়ের গোড়ালি। সেই গোড়ালি এই স্থানে এসে পড়ে। আর সেই থেকেই একান্ন পীঠের অন্যতম পীঠ হিসাবে তমলুকে দেবী বর্গভীমা রূপে পূজিতা হয়ে আসছেন। তবে প্রাচীন এই মন্দিরের বয়স কত তা অনুমান করা বেশ মুশকিল।
শিবপুরের হাজার হাত কালী মন্দিরের মাহাত্ম্য আজও অম্লান, রয়েছে নানান ইতিহাস,মহাভারতে উল্লিখিত তমলুকের ময়ূর বংশীয় তাম্রধ্বজ রাজাই নাকি এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। জনশ্রুতি আছে, রাজার আদেশে সেই সময় রাজ পরিবারে রোজ জ্যান্ত শোল মাছ দিতে আসতেন এক দরিদ্র ধীবরপত্নী। শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা। সারাবছর কী ভাবে জ্যান্ত মাছের জোগান দেন ওই ধীবর পত্নী ? এই প্রশ্ন জাগে রাজার মনে। রাজা চেপে ধরতেই গোপন কথা ফাঁস হয়ে যায়। ধীবরপত্নী রাজাকে জানান, জঙ্গলে ঘেরা একটি কূপ থেকে জল ছিটিয়েই রোজ মরা শোলকে জ্যান্ত করে তিনি রাজ দরবারে হাজির করতেন। ধীবরপত্নীর কথামতো ওই এলাকায় রাজা গিয়ে দেখতে পান উগ্রতারা রূপী দেবী বর্গভীমার মূর্তি। সেখানেই মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন রাজা। মোকাবিলায় তৎপর প্রশাসন, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় খোলা হয়েছিল কন্ট্রোল রুম। মায়ের নামকরণের অর্থ ব্যাখ্যা করে মন্দিরের সেবায়েত তথা আইনজীবী সমীরণ অধিকারী বলেন, ‘ধর্ম-অর্থ-কাম ও মোক্ষ।’ এই চারটি বর্গ দান করেন বলেই মায়ের নাম দেবী বর্গভীমা। নীল তন্ত্র মতে মায়ের আরাধনা করা হয় এখানে।’ কালীপুজোর দিন রাজবেশে মাকে সাজিয়ে মহা ধুমধামে পুজো হয়। বছরের অন্য দিনগুলিতে মাকে ভোর চারটেয় স্নান করিয়ে স্বর্নালঙ্কারে সাজানো হয়। অন্নভোগে নানা ব্যঞ্জনের পাশাপাশি এখনও রোজ মাকে নিবেদন করা হয় শোল মাছের ঝোল। ভক্তরাও মাকে মিষ্টি ভোগের পাশাপাশি মনোবাঞ্ছা পূরণে তাল, ওল, কচু এবং শোল মাছ নিয়ে মন্দিরে হাজির হন। ভিন ধর্মের মানুষজনও আসেন এই মন্দিরে।
দুপুরে মায়ের ভোগ গ্রহণ করার জন্য কুপন নিয়ে নিন, দক্ষিনা মাথাপিছু পঞ্চাশ টাকা। দুপুর পর্যন্ত মায়ের মন্দির দর্শন ,পূজো দেওয়া , নাট মন্দিরে বিভিন্ন কারুকার্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর মায়ের অন্নভোগ গ্রহণ করে বিকেলে দীঘা গামী বাসে চেপে পড়ুন। ওই পথেই কালিনগর একটি বাস ষ্টপেজে নেমে পড়ুন। রসুলপুর নদীর ব্রিজ পেরোলেই কালিনগর। ওখান থেকে টোটো বা ছোট গাড়ি করে পাঁউসি। মাত্র সাত কিলোমিটার রাস্তা।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের “মনচাষা” বলে একটি গ্রাম্য পর্যটন কেন্দ্র আছে। ওখানে রাত্রিবাস করার জন্য আগেই কোলকাতা থেকে বুক করতে হয়। ফোন নম্বর ০৯৮৩০০৫৭৫৬১, ০৯৮৩১০৯৫২৩৪ । ওখানে দেখতে পাবেন দুষ্প্রাপ্য গাছ গাছালির মহাসমারোহ। খড়ের ছাউনির ছোটো ছোটো কটেজ, আদ্যিকালের আসবাবপত্র, গরুর গাড়ি, চরকা, হ্যারিকেন, খোল করতাল, নকশা কাটা উঠোন কি নাই সেখানে! নদীর ধার বরাবর ঘুরে বেড়ানোর সুন্দর বন্দোবস্ত। ওখানেই খাওয়া দাওয়া সেরে রাত্রিবাস করার মজাই আলাদা। পূর্ণিমার রাত হলে খুব ভালো।
কখনো সখনো সিনেমার শুটিং ও হয়।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি মহকুমা অন্তর্গত আরো কিছু জায়গা সম্পর্কে বিশদ ভাবে লেখা যেতে পারে। এখন এই পর্যন্ত।
মন্তব্যঃ-
বিপ্লব বসু , ভ্রমণ আড্ডা
হাঃ! ভুল ত্রুটি ধরার যোগ্যতার প্রয়োজন। সেখানে আমাদের ঘাটতি আছে। আমরা দেখব আমাদের ভালো লাগল কিনা?
ধন্যবাদ।






