=কলির সকাল=
পূব আকাশে সূর্য উঁকি দেওয়ার আগেই মধ্য গগনে একাদশীর একফালি চাঁদ ভেসে যাওয়া মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছিল। সকাল হয় হয় এরকম সময়ে আমরা তিন বন্ধু প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়ে রোজকার মতো নিমতলায় বসেছি। আমি, পুলক ও কমল। কমল রাজনীতি বা দলীয় চিন্তা ভাবনায় থাকে, পুলক সবেতেই আছে আবার নেই, আমি গল্পবাজ নাটুকে ওদের সমর্থক। কমলকে একটু আনমনা দেখে আমি বললাম ‘একটা  গল্প বলি শোন, নিমগাছের গল্প’।
খড়্গপুরের কাছাকাছি এক নিমপুরা গ্রাম। গ্রামের মাঝামাঝি রাস্তার ধারে প্রায় একশো বছর পুরনো একটি নিমগাছ। এই গ্রামের মানুষ প্রায় আদিবাসী বাদবাকী অন্য। একটি মাত্র ব্রাক্ষ্মণ পরিবার। গ্রামের পুরোহিত বলতে ওই একজন নাম গৌরহরি ভট্টাচার্য। স্বামী স্ত্রী এক মেয়ে নাম কলি। কলিকে নিয়েই গল্প। বয়স কুড়ির কলি খুব ডানপিটে মেয়ে সবেতে ওস্তাদ। বাবা বাড়িবাড়ি পূজো করে ওই করে সংসার চলে। কলি বাড়ী বাড়ী বৌ মেয়েদের সঙ্গে আড্ডা জমিয়ে দিব্যি সময় কাটায়। যাদের বাড়িতে কলি যায় তাদের বাড়িতে চুরি চামারি লেগেই থাকে কলিই সমাধান করে।
কলির যে কি রুপ বিস্ময় তো ছিলই।টাকা পয়সা সোনা দানার লোভ অগাধ।
হঠাৎ কলি একদিন আবিষ্কার করলো নিমগাছ টি নিমদেবীরূপে আবির্ভাব লাভ করেছে। সে গাঁয়ে রটিয়ে দিল নিমদেবীর কাছে পূজো দিলে সবার মনস্কামনা পূর্ণ হবে। সকালে নিমদেবীর গায়ে সিঁদুর চন্দন ধূপ ধূনা ফুল দিয়ে পূজো করা তার নিত্য কাজ হয়ে দাঁড়াল। ব্রাক্ষ্মণ কন্যা কলির ফুলঝুরি কথায় বেশীরভাগ আদিবাসী মানুষরা নিমতলায় হাজির হতে আরম্ভ করলো। সবাই ফলমূল নৈবেদ্য সাজিয়ে নিমদেবীর কাছে পূজো দেওয়া শুরু করলো। কলি গ্রামের মানুষকে জানিয়ে দিল প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় নিমতলায় মেলা বসবে। মেলায় কেনা বেচা মতের আদানপ্রদান সবই কলির নির্দেশমত হবে। কারো কোনো চুরি গেলে নিমদেবীর কাছে প্রার্থনা জানালে তার চুরি যাওয়া জিনিস ফেরৎ পাবে। তবে আগে কলিকে জানাতে হবে। নির্দিষ্ট মন্ত্র উচ্চারণ করে ঠাকুরের অনুমতি সাপেক্ষে সমস্ত ঘটনার ছানবিন করে নিমদেবীকে সন্তুষ্ট করার পরে কলিই বলে দেবে সেই জিনিস কোথায় আছে বা কে নিয়েছে?
প্রতি শনিবার মেলায় কলি সারাক্ষণ চষে বেড়ায়, সবার সঙ্গে মত আদানপ্রদানের কাজ সারে কলি। পাশের পাড়ার অঘোর মান্ডীকে চেনে কলি। সে একবার কলিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। কালো কুচকুচে হাঁড়িয়া খোর আদিবাসী বলে বোধ হয় কলির পছন্দ হয়নি। কলি খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও কলির যে মন ছিলনা তা নয়। আর কেই বা আছে নিমপুরা গ্রামে তার সমকক্ষ! কলি ফর্সা সুন্দরী তন্বী ব্রাক্ষ্মণ কন্যা, এদিকে যুবক ঘোর সুঠাম সবল লম্বা কলির আপত্তি কিসে?
কলির এই ব্যবসায় বাবা সন্তুষ্ট। কলির রোজগার বেড়েছে মাঝে মাঝে শহরেও যায় সে।
একদিন কলি তার বাবার কাছে বায়না ধরলো কানের দুল গড়িয়ে দিতে হবে।
বাবা উপায়ান্তর না দেখে -মেয়ের আবদার -খড়্গপুরের প্রখ্যাত স্বর্ণ ব্যবসায়ী শিবনাথ দাশের কাছে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন।
মেয়ের পছন্দমত একজোড়া কানের দুল কিনে দিলেন। দাম যাই হোক না কেন শিবনাথ বাবু গৌরহরির কাছ থেকে একটি ও পয়সা নিলেন না। অবাক কান্ড, গৌরহরি সাধারণ  পূজারী ব্রাক্ষ্মণ । কথায় আছে সামান্য দুধকলার জন্য পুরোহিত দশ ক্রোশ পথ হাঁটে। গৌর তাড়াতাড়ি মেয়েকে নিয়ে সেখান থেকে চলে এলো।
একদিন মেলায় কলি ঘুরছিল হঠাৎ ঘোর কলিকে জাপটে ধরে তার কপালে সিঁদুর ও গলায় মালা পরিয়ে দিল। আর যায় কোথায় কলি ভীষণ রেগে ভয়ঙ্কর মূর্তি ধরলো। সে ঘোর কে টেনে নিয়ে গিয়ে নিমদেবীর গুঁড়িতে বেঁধে ফেললো। বেদম প্রহার করলো। ঘোর বরং আনন্দ পেলো। যদি কলির মন গলে। শেষমেষ গ্রামের মানুষরা তাকে উদ্ধার করলো। সেদিন রাতে কলিকে নিমদেবীর স্বপ্নাদেশ হল ঘোর মান্ডীকেই  বিয়ে করতে হবে।
হঠাৎ পুলক অত্যন্ত পুলকিত হয়ে একটি শব্দ উচ্চারণ করল ‘ঘোর কলি’।
কমল শুধুই হাসলো মনে হয় পুলকের মন্তব্যটা তার মনের মত হয়নি।
কয়েকদিন পর কলি একদিন মেলায় ঘুরছিল,হঠাৎ তার কানের দুলটা টান মেরে কেউ যেন নিয়ে গেল। কলির চীৎকারে মেলা শুদ্ধ লোকেরা ভীড় জমালো। সবাই অবাক ,গুনীন কে আবার সাপে কাটে!
কলি সারা মেলা ছুটে বেড়ালো ঘোরকে আর খুঁজে পায় না। শেষে নিম দেবীর কাছে মাথা ঠুকতে লাগলো। এতদিন সে গাঁয়ের চুরির জন্য নিম দেবীর নির্দেশে ঘোর মান্ডিকে চোর সাজিয়েছে। গ্রামের মানুষ সবাই জানে ঘোর পাকা চোর। কলিও কম যায় না । তার বাবা আরো লোকজনকে নিয়ে কলি ঘোরের বাড়িতে হাজির হলো। ঘোরের বাপ মা অবাক আবার কি বিপদ দুয়ারে! ঘোর বাড়ি না থাকায় কলি গ্রাম মাথায় তুলে জানান দিয়ে আসে আজ রাতের মধ্যে তার চুরি যাওয়া দুল নিম দেবীর স্থানে যেন ঘোর নিয়ে হাজির হয়। তবেই ঘোর কলির সকাল হবে। নইলে নিম দেবীর কোপে গোটা গ্রাম জ্বলবে।
পরদিন সকালে কলি নিমের গোড়ায় পূজায় ব্যস্ত। কলির পেছনে ঘোর কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পূজা শেষে কলি ঘোরকে দেখে আনন্দে আটখানা।  কলি ভাবে নিম দেবীর স্বপ্ন তার জীবনে আসল সত্য হয়ে ফিরে এলো।
ঘোর একটি সোনার হার দেখায়।
কলি ঘাবড়ে গিয়ে বাকরূদ্ধ হয়ে যায়। ঘোরের কাকীমার হার তার হাতে!
ঘোর বলে -“এই হার চুরির দায় আমার ঘাড়ে চাপিয়েছিস না? এবার তোরে কে বাঁচায়? তোর নিমদেবীর আর কোনো ক্ষমতা নেই তোকে বাঁচাবার। আজ মেলায় সবাইর সামনে তোর সব কীর্তি ফাঁস করে দেবো। “
কলি ঘোরের পা জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। কলি যদি কথা দেয় বিয়েতে রাজি ,তবেই সে সব গোপন রাখবে। তার কাকীমার হার ফেরত দিয়ে নিজের ঘাড়ে দোষ নিয়ে নেবে। তার কানের দুল ও সে পাইয়ে দেবে।
কলি রাজী হয়ে যায়।
ঘোর তারপর থেকে হাঁড়িয়ার ফোয়ারা উড়িয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
কমল বললো -“চোরে চোরে মাসতুতো ভাই”।
পুলক বললো -“ঘোর কলি যে”।
একদিন সকালে ঘোর নিমতলায় হাজির। ঘোর কানের দুলটা কলির হাতে দিয়ে কলিকে জড়িয়ে ধরে। ঘোর কলি দুজনেই খুশী। সেই অন্তরঙ্গ মুহূর্তের স্বাক্ষী থাকলো নিমগাছ, নিমদেবী। কলির সেই সকাল তাদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলো।  গোটা গ্রামে এই খবর মূহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো।
এদিকে কলির বাবা গৌরহরি মেয়ের এই অসামাজিক বিবাহ মেনে নিতে পারলোনা। ঘোরের পরিবার ও পুরোহিতের মেয়ের সঙ্গে অসবর্ণ বিবাহ সম্পর্ক গ্রামের পঞ্চায়েত বসে তাদের কে বয়কট করলো।
অগত্যা ঘোর কলির নিমদেবীর চরণতলে আশ্রয়স্থল হয়ে উঠলো। সেখানেই তারা ঘর বেঁধে বসবাস শুরু করলো।
ব্যবসায়ী শিবনাথ দাসের ঘোর কলির সঙ্গে যুক্ত থাকার একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত গৌরহরি সেদিন পেয়েছিল। তা না হলে বীনা পয়সায় কানের দুল কেউ দিয়ে দেয়!
দিন যায় ঘোর কলির দ্বন্দ্ব দিনকে দিন বেড়ে চললো । গোটা গ্রাম পাড়াকে অতীষ্ঠ করে তুললো ওদের ঝগড়াঝাটি মারামারি। নিমদেবীর কাছে মানুষ আর নৈবেদ্য নিয়ে আসে না। গোটা গ্রাম জুড়ে চুরি, ঘোরের অত্যাচারে সবাই ভীত সন্ত্রস্ত। রাতদিন হাঁড়িয়ার নেশায় মত্ত হয়ে কলির উপর অকথ্য অত্যাচার চালাতে লাগলো। কলি মেয়ে মানুষ যতই হোক ব্রাক্ষ্মণ কন্যা, সে গ্রামের মানুষকে ঘোরের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুললো। পঞ্চায়েতের সালিশী সভায় ঘোরের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের দাবী তুললো। মানুষ ঘোরের বেলেল্লাপনা দেখে কলিকে সমর্থন দিল। হঠাৎ একদিন নেশায় উন্মত্ত হয়ে ঘোর কলিকে মেরে ফেলার জন্য ছুরি নিয়ে কলিকে আক্রমণ করে। কলি ক্ষমতায় কম যায় না। জাপটে ধরে ঘরের দাওয়ায় তাকে সারাদিন বেঁধে নির্জলা ফেলে রাখলো। সকাল হতে কলি ঘুম থেকে উঠে দেখে ঘোর নেই। কলি নিমদেবীর কাছে প্রার্থনা জানালো আর যেন সে কোনোদিন ফিরে না আসে। পরে জানা গেল গ্রামের এক বউকে নিয়ে ভেগেছে। পরে কলিকে এ ঘটনার বিচার আচার ও করতে হয়েছে।
কলি ব্যথিত অন্তরে দিন কাটাচ্ছে। এমন সময়ে পঞ্চায়েত ভোটের দামামা বাজলো। কলিকে পঞ্চায়েত ভোটে দাঁড় করাবার সিদ্ধান্ত নিল গ্রামবাসী। কলি রাজী হয়ে গেল। বিপুল ভোটে জিতলো কলি। পঞ্চায়েত প্রধান হয়ে গেল। নিমপুরায় এবার উন্নয়নের ফোয়ারা ছুটলো। কলির ব্যস্ততার শেষ নেই। সবমূলে কলি, কলি ছাড়া নিমপুরা অচল। কলির পাকার বাড়ী হয়েছে নিমতলা সান বাঁধানো হয়েছে।
হঠাৎ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে দালানে টাকা ভর্তি ব্যাগ। ব্যাগটি খুলে দেখে একটি চিঠি, চিঠিতে তাকে আজাদ পার্টি থেকে ডেকে পাঠানো হয়েছে খড়্গপুরের পার্টি অফিসে। ব্যাপারটা কঠোর ভাবে গোপন রাখতে নির্দেশ ও দেওয়া আছে। কলি আর কালবিলম্ব না করে পার্টি অফিসে নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হয়। আজাদ দলের সেই মিটিং এ সিদ্ধান্ত হয় কলিকে তারা তাদের নেত্রী হিসাবে আগামী বিধানসভা ভোটে লড়ার জন্য খড়্গপুর বিধানসভা কেন্দ্রে দাঁড় করাবে। কলির এবার যেন পায়ের তলার মাটিটা আরো  শক্ত হয়ে গেল। হলো ও তাই আজাদ দলের হয়ে লড়তে গিয়ে বিরোধী দল হিসাবে বিধানসভায় বাতেলাবাজ কাকলি ভট্টাচার্য দলের প্রধান নেত্রীর মর্যাদা পেল। দুঃখের বিষয় ঝগরাটে কলি বেশকিছু জায়গায় তার ক্রোধ ও লোভের কারনে কিছু সৎ নেতার থেকে দূরে সরে যেতে লাগলো। চুরি চিটিংবাজী মিথ্যার আশ্রয়ে থেকেও মানুষের কাছে অনায়াসে তার বাকপটুতায় মানুষ কে সে বশ্  করতে পেরেছিল।
বছর পাঁচেক পরে হঠাৎ সে সমাজ পরিবর্তনের ডাক দিল। তার নেতৃত্বে একটি দল গড়ে ফেললো। সেই দলের নাম দিল নির্মূল দল। পরবর্তী ভোটে রাজ্যজুড়ে বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতায় বিধানসভা দখল করলো। নির্মূল দলের প্রধান নেত্রী সে, সেই সর্বেসর্বা। নিজেই রাজ্যের দায়িত্ব নিয়ে রানী হয়ে গদীতে বসলো। শহরে বাড়ী গাড়ি সিকিউরিটি  পুলিশ সবই তার চাকর বাকর।
কিছুতেই কলির রাজ্য রাজনীতি আর ভালো লাগছিল না।
একদিন রাত্রে হঠাৎ নিমদেবীর স্বপ্ন দেখে সেই রাতে অত্যন্ত গোপনে কাউকে কিছু না জানিয়ে সাধারণের বেশে নিমপুরায় পৌঁছে গেল সে। সকাল হতেই সে দেখলো অঘোর মান্ডী নিমগাছের গোড়ায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
বুক ফাটা কান্না আর আটকে রাখতে পারলোনা সে। সে তার অবশ হাত দুটিকে প্রসারিত করে নিমগাছকে জড়িয়ে ধরে হাঁউমাঁউ করে কাঁদতে লাগলো। তরুণ সূর্য সবে উঁকি দিচ্ছে এবার সকাল হবে। কলির অনেক সকালই এই নিমগাছ তার বুকের মধ্যে রেখেছে যত্ন করে। আজ তার জীবনের শেষ ও প্রথম কলির সকাল।

======


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *