সুদীপের লেখা থেকে-31.08.2020
।। চুপি চুপি কথা, শুনতে নেই।।
গাড়িতে একটু ফাঁকা ফাঁকা বসা ভালো। এই সময়ে এটা মানা উচিত।
তা ঠিক। তবে এইরকম যাওয়াতে যাকে বাদ দিয়ে ভাবা যায় না, বা বলা ভালো ভাবা যেত না, সেই অনিল দাস তো কোরোনা ছাড়াই হারিয়ে গেছে। কিংবা ওই যে অশ্বিনীদা। এক প্রাণোচ্ছল মানুষ তিনিও তো এই আছি এই নেই বলে হটাৎ এরকম এক অপরাহ্নে হারিয়ে গেল। তাই কাছে বসো আরে দূরে থাকো হারাতে আমাদের একদিন হবেই।
গতকাল যাত্রার শুরুতে হয়তো একটু বিষাদ এবং কঠিন কথা হয়ে গেলেও থমকে গেল না গাড়ির চাকা।কাঁথি থেকে কুড়ি কিমি দূরে চোদ্দমাইল।রনেনের বাড়ি। ফ্লাক্সে চা করে দাঁড়িয়ে থাকতে বললাম। যাতে দুপুরের আহারের পর এক চুমুক চায়ে গলা ভেজানো যায়। জানি এসব কাজ ও কতো ভালো করে করতে পারে। এরকমই একবার দীঘা যাচ্ছি। সঙ্গী আমার এক নিকট পরিবারের কাকু, কাকীমারা। চোদ্দমাইলের কাছাকাছি যাওয়ার সময় মনে হলো একটু চা খেলে ভালো হতো। ভাবনাটা মাথায় আসতেই ফোন রনেনকে। একটু চা বসাও। পাঁচ ছয়জন খাবো।দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যেতেই কর্তা গিন্নি মিলে চা এবং ‘টা’য়ের প্রাতরাশ হাজির করে দিল। এরকম অনেকবার হয়েছে। পনেরো কুড়ি জন মিলে (সঙ্গে রনেন ও তার ফ্যামিলি সহ) দীঘা/ শংকরপুর থেকে পিকনিক করে ফেরার সময় রাতের বেলাও এক কাপ চায়ে তোমাদেরকে চাই। ওর বাড়িতে।
এবার কাজের কথায় আসি। কাজ ঠিক নয় অকাজ। দু দিকে সবুজ রাস্তা মাড়িয়ে চললাম আমরা। আমরা অর্থে কমল তোলা, পুলক ধর, সুধাংশু রাউৎ । হ্যাঁ, হ্যাঁ আমিও ছিলাম। সুধাংশুদা শুরু করলেন সেই ১৯৭৯ সালের গল্প। রেডিওতে তার নিজের লেখা নাটক ও ক্ষৌনিশ বাগচীর প্রযোজনায় ‘ভুল’ পরিবেশনের গল্প। নাটক শেষে হতেই পৌছে গেলাম রনেনের বাড়ির সামনে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক নিয়ম মেনে।
তারপরই বাঁয়ে মোড়। শংকরপুর।এখান থেকে রনেনের নিয়ন্ত্রণে। প্রথমে চম্পা খাল/নদীর পাড়। মনে হলো জিজ্ঞাসা করি ,ও নদী রে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে।কিন্তু তার আগেই ডাক পড়লো গাড়িতে ওঠার।সমুদ্র পাড়ে পৌঁছে পাল্টে যাওয়া, ভেঙে যাওয়া নতুন শংকরপুরকে দেখা, শোনা আর আলোচনা চললো।
দেখা গেল সারি সারি বসার জায়গা।যারা বসবে তারা কোরোনাতে আটকে।কিন্তু সমুদ্রের ঢেউ মুহূর্তে মুহূর্তে সে সব জায়গায় আছড়ে পড়ছে। দেখে যাচ্ছে কয় জন এলো তাকে দেখতে। কিন্তু বারে বারে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে।হয়তো বা ভাবছে সত্যিই কি সে দেখতে এতো খারাপ হয়ে গেছে? নাহলে আজ পাঁচ মাস ধরে প্রতিদিন দুবেলা কনে সেজে বের হলেও কেউ দেখতে আসে না কেন? চুপি চুপি বললাম চিন্তা কোরোনা। সবাই তোমাকে এখন অন লাইনে দেখছে। হয়তো তোমার নরম পেলব ছোঁয়া নিজেদের গালে ছোঁয়াতে পারছে না ।তবে দেখছে। বার বার। মোবাইলে, ল্যাপটপে, ডেক্সটপে। তাই তো তুমি কখন কতটা উচ্চতায় লাফিয়ে উঠলে বা কতটা ভেসে গেলে তা নিয়ে কত আলোচনা চলে তুমি জানো? তুমি শুনতেই পাওয়া না। একটা মোবাইল কিনে নাও। হয়তো ওদের ব্যাথা তুমিও বুঝতে পারবে। কারণ এখন তো ওই মোবাইলের মাধ্যমেই সব অনুভূতি , জন্ম থেকে মৃত্যু, ভালোবাসা থেকে বিচ্ছেদ, প্রশংসা থেকে নিন্দা, এমনকি সব বিপ্লবও ওখানে হয়ে যাচ্ছে। আর পাশে দাঁড়াতে হয় না।রাস্তায় নামতে হয় না। এখন ঘরের মধ্যে অনেক ঘর। কেউ কাউকে দেখতে পায় না। কিন্তু সব খবর পায়। আসলে তোমার তো কোনো স্বার্থ নেই। তুমিতো সবাই কে শুধু দিয়েই যাও। নিজের উন্নতি অবনতির ভয় নেই। নেই তোমার মৃত্যু ভয়ও। আসলে তোমার কিছু হারানোর ভয় নেই।কিন্তু যারা তোমার কাছে শুধু নিতে আসে তাদের অনেক ভয়। সব হারানোর ভয়। অথচ তারা বোঝে না তাদের থাকা বা না থাকার মধ্যে কোনো কিছু যায় আসে না। কিন্তু তোমার থাকা না থাকা, রাগ করে ফুঁসে ওঠার মধ্যে অনেক কিছু যায় আসে। তাই একটু সবুর করো। তারা আসবে। নিজেদের স্বার্থেই তারা আসবে। জানি তুমি সেদিন মুচকি মুচকি হাসবে আর বলবে কি ব্যাপার?আর রক্ত মাংসের প্রেমিক, প্রেমিকা বা ভালোবাসার মানুষদের আর আর পছন্দ হলো না বুঝি!
আরে কোথা থেকে কোথায় চলে এলাম। দেখি সন্ধ্যা নেমেছে। জল দেখতে দেখতে হটাৎ দেখি আঁধার। রাস্তার আলো। আবার জলের উপর আলো। চাঁদের আলো।মনোরম দৃশ্য।
তাই এবার ফেরার পালা।কিন্তু আবার আটকে গেলাম চোদ্দমাইলে। রনেনের মেয়ের হাতে তৈরি কেক খাওয়ার জন্য।
চিন্তা নেই কখনো যেতে যেতে মনে হলে ওই মোড়ে গিয়ে রনেন মাইতির নাম বলবেন।নিশ্চিত চা, টা পেয়ে যাবেন।
ভালো থাকবেন সকলেই।




