মনে পড়ে সেই’ বাঞ্ছারামের বাগান ‘ চার বন্ধু প্রথম কলি পত্রিকার জন্য পাগল ছিলাম। বরেন মান্না,বীরেন প্রধান , কালিপদ মাইতি ও আমি। ১৯৭৭ সালে আমি রামরাজাতলায় থাকতাম। কালিপদ তখন রেলে চাকরি করতো। রামরাজাতলায় থাকতো। কালিপদর বাড়ি আমাদের পাশের গ্রামে। আমি তখন কলকাতায় একটি চ্যাটার্ড একাউন্টেন্ট ফার্মে কাজ করতাম। আমার তখন নাটক লেখার অদম্য ইচ্ছা। শ্রুতি নাটক তখন বেতার নাটক হিসেবেই কল্পনা করে লিখতে হতো। ১৯৭৯ সালে বেতার ঘোষক ক্ষৌনীশ বাগচীর বাড়ি ছিল রামরাজাতলায় । সৌভাগ্য বশতঃ তাঁর দয়ায় জগন্নাথ বসুর কাছে আমার বেতার নাটকে হাতেখড়ি। কালিপদর বাবা ও আমার বাবা কলকাতায় চাকরি করার সময় বাংলা ও উড়িষ্যার বিখ্যাত যাত্রাদলের হিরো হিসেবে ভাড়া যেতেন। পিতার যোগ্যপুত্র হিসেবে আমি ও কালিপদ কম ছিলাম না। আমি নাটক লেখায় কালিপদ অভিনয়ে। রাজযোটক মিল। কালিপদ একদিন মনোজ মিত্রের বাঞ্ছারামের বাগান থিয়েটার দেখাতে নিয়ে গেল। মনোজ মিত্রের অভিনয় দেখে সে যেন পাগল হয়ে গেল। শয়নে স্বপনে সেই বাঞ্ছারাম। আমাকে প্রস্তাব দিল থিয়েটারের আদলে গ্রামে খোলা মঞ্চে অভিনয়ের জন্য বাঞ্ছারাম নাটক লিখতে হবে। আমি ও কাটছাঁট করে একটি নাটক লিখে ফেললাম। তখন ষ্টেজে অভিনয়ের জন্য মনোজ মিত্রের বাঞ্ছারামের বাগান সাজানো বাগান নামে একাংক নাটক বেরিয়েছে। আমি বইটি কিনে আনলাম। সেই বইটি পড়ে বুঝলাম। অনেক চরিত্রের সমাবেশ। আমি ডাইরেক্টর নাম ভূমিকায় কালিপদ। মোটামুটি কালিপদকে বাঞ্ছারামের জায়গায় রেখে। অন্য চরিত্র ও ডাইলক বাদছাদ দিয়ে একঘন্টার নাটক তৈরি করে ফেললাম। এবার সাউন্ড এফেক্ট ও ব্যাক গ্রাউন্ড মিউজিক তাও আমাকে করতে হবে। কালিপদ শুধু বাঞ্ছারাম হবে। সাউন্ড এফেক্ট ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এর ব্যাপারে সে আর এক গল্প। কয়েকবারই ওই থিয়েটার দেখতে হয়েছে। রামস্বরুপ গনরিওয়ালা এক শিল্পপতি আমার ক্লাইন্ট ও বন্ধু জাপান থেকে একটি টেপ রেকর্ডার এনেছিল। তৎকাল সময়ে আমাদের ভারতবর্ষে টেপরেকর্ডার তৈরী হতো না। টেপরেকর্ডার সম্পর্কে আমাদের কারোরই কোন ধ্যান ধারণা ছিল না। তা যে কোন কারনেই ওই টেপরেকর্ডার টি অকেজো হয়ে যায়। রামস্বরুপ জী আমাকে একদিন তার বাড়িতে ডেকে গোপনে ওই টেপরেকর্ডার টি দিয়ে বলে সেটা সারিয়ে দিতে হবে। আমি তখন যে একজন বড় মেকানিক সেটা আগেই সে প্রমাণ পেয়েছিল। আগেই আমি প্রমাণ দিয়েছি জাপানি দেশলাই রেডিও,ভাট69 রেডিও সারিয়ে। তখনকার বিদেশি ইলেকট্রনিক গুডসের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।সে যাই হোক। টেপরেকর্ডার টি সারিয়ে থিয়েটার হলে সাউন্ড ও মিউজিক রেকর্ড করে গ্রামের মানুষকে তাক লাগিয়ে দিলাম। সাজানো বাগানের প্রথম অভিনয় রামরাজাতলা আদর্শ সংঘের মাঠে তারপর আমাদের গ্রামে। কালিপদর অভিনয় মনোজ মিত্রকে ও লজ্জা দিয়েছিল। কালিপদ তো অনেক আগে চলে গেছে। বরেন ও নেই শুধু বীরেন ও আমি আছি। এবার প্রবাদপ্রতিম সেই বাঞ্ছারাম ও চলে গেলেন। তাঁর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে আমার নয়ন অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো।

