= জন্মমাটি =
জন্মেছি এক গাঁয়ে,
ছাগ পাড়া গ্রাম।
কভু ঝড় কভু বাদল,
বাদলপুর নাম।।
শৈশব গেছে সুখে দুঃখে,
তেরোশো আঠান্ন সাল।
গাঁয়ের বুক চিরে গেছে,
উড়িষ্যার খাল।।
কুঁড়ে হলেও শান্তি,
বসলে খালের ধারে।
পারাপারের চাপ ছিল,
মালী তদারকি করে।।
চাপে চেপে ওপারে,
জল ছুঁয়ে যেতাম।
ভাবি খালে ভেসে গেলে,
সাগরের দেখা পেতাম।।
উনিশশো উনসত্তর,
বন্যায় ডুবে হলো সাগর।
ভাসলো দেশ ভাসলো গ্রাম,
হলো না খোঁজা সাগর।।
স্বপ্ন অনেক শিশুমনে,
এখন খুঁজে ফিরি।
বন্যায় ডুবলো গ্রাম ঘর,
ভাসাই কলার তরী।।
সমুদ্র জল যখন টেনে নিল,
ঘর হযেছে শ্মশান।
খাল বিল পুকুর ডোবা,
সবই সমান সমান।।
কোথায় কাঁকুড়ি ,
চিচিঙ্গা ,তরিফুল।
মক্কা মাইলয় পেট ভরে না,
কেঁদে হই আকুল।।
শৈশবের প্রিয় গ্রাম,
ছাড়তে হলো পেটের দায়ে।
কোলকাতা গেলাম চলে
স্মৃতিটুকু বয়ে নিয়ে।।
রাজস্থানী বাবুর অফিসে ,
ফাইফরমাস খাটি।
সারা কলকাতা খালি পায়ে ,
সারাদিন হাঁটি।।
খাবার দোকানে ডালপুরি,
মিষ্টি সারি সারি।
চোখ জলে ভরে ওঠে,
সামলাতে না পারি।।
বুকে পাথর বেঁধে শক্ত মনে,
ভাবি গাঁয়ের কথা।
মায়ের কথা ভেবে ভেবে,
মনে পাই ব্যাথা।।
গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে,
কোন কাজ নাই।
মায়ের পেটে জন্ম ,
সেই পেটে ভাত কেমনে তুলে দিই।।
বিধাতা যখন বিরুপ হয়,
সবাই লাথি মারে।
গরীবরা আরো গরীব হয়,
না খেয়ে মরে।।
বাবুরা ফূর্তি করে,
অফিসে সন্ধ্যাকালে।
বিলিতি আন শেয় আন,
কাজু আন অন্ধ হয় মালে।।
খানদানি বাবুর অফিস,
মাইনে দেয় দশ টাকা।
সকাল থেকে রাত খাটায়
থাকি নাকো একটু ফাঁকা।।
রাত হলে ফুটপাতে,
শুয়ে পথের ধারে।
বেশী রাতে কাঁদে কুকুর,
চোখে জল ঝরে।।
বাবুর বৌর চোখ রাঙানি,
বুক কেমন করে।
বাবুর বৌর ফোন হয়,
দশটা কলা আনবে ঘরে।।
বাবু বলে এক ডজন,
কিনে ঘরে দিয়ে আস।
বার পয়সা দুবার গুনে,
দিল হাতে তাড়াতাড়ি এসো।।
কলার ডজন বার পয়সা,
এক পয়সায় একটি কলা।
মন চায় একটি কলা,
খেলে জুড়াবে পেটের জ্বালা।।
দশ পয়সায় ডজন কিনে,
বাবুকে দু পয়সা ফেরত দিবো।
ভাবলাম বাবু খুশী হবে,
বিশ্বাসটা বাড়িয়ে নেবো।।
বাবুর বউ বলেছে দশ,
বাবু বলেছে বারো।
দুটি যদি খায় সে,
ক্ষতি হবে কি কারো?
বাবুর ঘরের দরজায়,
কলিং বেল বাজায়।
ঝি এসে গেট খুলে
বারোটি কলা নিয়ে যায়।।
পরদিন দু পয়সা বাবুকে ফেরত দিলাম,
বাবু বলে দুটি কলা কোথায় গেল?
কথা শুনে আমার মাথায়
বাজ পড়ে গেল।।
এক ডজন কলা গুনে,
দিয়েছি ঝিয়ের হাতে।
বউ বলেছে দশটি কলা,
বার ছিল না তাতে।।
এক ভজন কলায়,
দুটি কেন গায়েব ?
পয়সা চুরি কলা চুরি
কিছুই করিনি সাহেব।।
বাবু আমার কোন কথা,
কানে নাহি নিল।
ক্রোধে অন্ধ হয়ে মালিক,
আমায় তাড়িয়ে দিল।।
বিচার এবার করবে কে আর,
সবই ভাগ্যের খেলা।
আর নয় এই শহর,
ছাড়ি সকালবেলা।।
সকাল সকাল ঝি ছোটে,
ফুটে আমায় খোঁজে।
কলা কে সরালো,
কবুল করবে নিজে।।
ভাগ্যের খেলায় হেরে গেছি,
ঝিয়ের দোষ কি!
ক্ষিদের জ্বালায় যা করিনি,
শুধু মায়ের মুখটা ভেবেছি।।
বীনা টিকিটে ফিরছি ঘরে,
রেল দুদিন জেল দিল।
বাসের কন্ডাক্টর মার দিয়ে
জামা খুলে নিল।।
গ্রামে এসে চোখে দেখি ,
শ্মশান হয়েছে ঘর।
মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সবাই,
কেউ জানে না মায়ের খবর।।
একবার দেখা দাওগো মা,
কোথায় তুমি গেছ চলে!
দুর্ভিক্ষ নিল মাকে,
আমাকে কিছু না বলে !!
কেমনধারা বিধির নিয়ম,
কোথায় মা লুকিয়ে গেলে!
মাথায় বাজ বুক ফাটে,
এসেছি মা তোমার ছেলে।।
তুমি যেথায় থাক, সঙ্গে নাও,
আমি আছি তোমারই কোলে।
                  🚶‍♂️🏃‍♂️













6 thoughts on “জন্মমাটি ✍️ Janmamati

Leave a Reply to Kamal Kanta Tola Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *