ছত্তিশগড়ের পথে -১
আজ থেকে সতেরো বছর আগে ঘটেছিল এক ঘটনা যা এখনও আমার মনকে উদ্বেলিত করে। আমার তিন মেয়ে সোনা রুপা দীপা। আমার পাশের গ্রামের এক বন্ধুর ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলাম মেজো মেয়ে রূপালী কে। বন্ধু চাকরি সূত্রে ছত্তিসগড়ের কোরবায় থাকতো। সাউথ ইষ্টার্ন কোল লিমিটেডের ডাম্পার অপারেটর ছিল সে। এস ই সি এল এর কোয়ার্টারে থাকতো তার পরিবারকে নিয়ে। আমার জামাই ওখানকার লায়ন্স হাইস্কুলের ইংলিশের শিক্ষক। বিয়ের পরে প্রতি বছরই কোরবা যাতায়াত চলছে। সাড়ে সাতসো কিলোমিটার যাত্রা পথ কখনো ট্রেন কখনো নিজের কারে। ওড়িশা ছত্তিসগড়ের রাস্তার মনোহারিণী দৃশ্য দেখতে দেখতে যাত্রাপথ অত্যন্ত সুন্দর স্বচ্ছন্দময় হয়ে ওঠে তা অবর্ণনীয়। আবার ওড়িশা ঝাড়খন্ডে ছত্তিসগড় মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান যেমন অমরকণ্টক ফরেষ্ট রেঞ্জ, কেওনঝড় ফরেষ্ট রেঞ্জ, টাটা ষ্টীল কারখানা ইত্যাদি। যতই বলিনা কেন কারে যাওয়ার সময় একবার এক বিপদ ছত্তিসগড় ও ঝাড়খন্ড বর্ডারে ঘটেছিল,আবার ট্রেনে খড়্গপুর থেকে বিলাসপুর যাওয়ার পথে এক বিপদ ঘটেছিল যা রীতিমতো রোমহর্ষক রোমাঞ্চকর বলা যেতে পারে। দুহাজার সাত সালে ছত্তিসগড় মানে মাওবাদীদের স্বর্গরাজ্য। সাহস ও নেশা যাই বলি না কেন গাড়ি করে ছত্তিসগড় জীবন হাতে নিয়ে যাওয়া আমার জীবনের নতুন অধ্যায়ের নবজন্ম। টাটা হয়ে রাঁচি -পত্থলগাঁও হয়ে কোরবা। ঝাড়খন্ডের পত্থলগাঁও ছত্তিসগড়ের সীমান্ত এলাকা দেড়শো কিলোমিটার অরণ্যপথ। গুগল ম্যাপে রাস্তা দেখাচ্ছে ঠিক কিন্তু! আমার স্বামী স্ত্রী মেয়ে রুপা আর তার তিন বছরের মেয়ে ও গাড়ির চালক। পাঁচ জন সওয়ারি। আমি গাইড। ভোর ছটায় কাঁথি থেকে রওনা হয়ে সারাদিন গাড়ি চালিয়ে সাড়ে পাঁচশো কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছে মৌলিক। চোস্থো ড্রাইভার। দুপুরে স্নান খাওয়া টাটা চান্ডিলের রাস্তায় সেরেছি। সঙ্গে রান্না করা খাবার ডিমের ঝোল ভাত ঘর থেকেই নিয়েছিলাম।জামশেদপুর থেকে চান্ডিলের রাস্তা ফোর লেনের ওটাকেই টাটা রোড বলা হয়। আমরা চান্ডিলের পাথর দিয়ে পাকা ঘরে ঢালাইর কাজ করে থাকি। পাহাড়ে পাহাড়ে ছয়লাপ । কালো কালো পাথর নিয়ে শ শ লরি ওই রাস্তায় চলছে। রাস্তা আছে বলে মনে হচ্ছে না। চারদিক ধূলোর ধোঁয়া দুপুর দুটোর সূর্যকে যেন আড়াল করেছে। মাঝে মাঝে সাইনবোর্ডে এলিফ্যান্ট করিডোর বলে লেখা। দিনে আমাদের আবার ভয় কি? তবে গাড়ি আদৌ চলছে না। টাটা থেকে রাঁচি পর্যন্ত দেড়শ কিলোমিটার পাড়ি দেওয়া রাত নেমে গেলে মুশকিল আছে। পরে পরে রাস্তা একটু ভালো থাকায় রাঁচি বাইপাস করলাম সন্ধ্যার আগেই। পত্থলগাঁও তে পৌঁছলাম রাত সাড়ে নটা। অচেনা জায়গা। শহর বটে কেমন যেন ভয়। মানুষ দু একজন কেউই সঠিক কথা বলার জায়গা বা বোঝার জায়গায় নেই। ট্রাফিকের পুলিশকে দেখলেই মৌলিক পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। অবশেষে একটি পাম্পে এসে গাড়ি দাঁড়ালো। পাম্পের লোকটির কাছে জানতে চাইলাম। রাস্তাটি কি রকম? সে বললো -রাতকো উস রাস্তেমে যানা ঠিক নেহী। উধার দেখিয়ে বোর্ড লগা হুয়া। ভালু হাতী নিকালতা। আপ লোগ ইধারই ঠারিয়ে,শুভামে যানা ঠিক রহেগা।অগত্যা সিদ্ধান্ত নিলাম রাতটা পাম্পেই কাটিয়ে দেবো। ড্রাইভার মৌলিক সঙ্গে নেওয়া রুটি তরকারি খেয়ে সামনের সিটে শুয়ে পড়লো। আমরাও তদনুরূপ খেয়ে গা এলিয়ে দিলাম। হঠাৎ দেখি যেদিকে যাবো সেদিক থেকে দুটি মোটর সাইকেল পাম্পে ঢুকলো। রাত তখন এগারোটা, ভাবলাম ওরা বোধহয় তেল নেবে। কিন্তু তেল না নিয়ে দুজন দাঁড়িয়ে কথা বলতে লাগলো। মুখের কথায় সাহস দেখালেও ভেতরে ভেতরে ভয়ে সেঁধিয়ে ছিলাম। মৌলিক তাড়াতাড়ি দরজা খুলে সেই দুজনের সঙ্গে কথা বলে গাড়িতে উঠে বসলো। বললো -কাকু ওরা বলছে কোনো ভয় নেই যাওয়া যাবে। আমি বললাম -তোর কি মাথা খারাপ আছে! ওরাই হয়তো মাওবাদী ডাকাত আমাদের যেতে বলে আমাদের পেছন পেছন গিয়ে আমাদেরকেই ধরবে। যা কিছু আছে ছাড়িয়ে নিতে পারে। আবার মেরে ফেলতে ও পারে। ওরা মাওবাদী, তুই অত সাহস দেখাস না। পাম্পের লোকটা ওতো নেই। মৌলিক বললো -আজ রাতে আমরা ওই রাস্তা দিয়ে যাবো মাওবাদী রা জানে নাকি? আমি বললাম- দুর বোকা, দাঁড়া ওরা কি করে দেখি।খানিক পরে ওই দুজন উদাহ হয়ে গেল। মৌলিক কে বললাম-দেখলি, ওই দুজন এখানে কি জন্য এসছিল? তেল নিল না, পাম্পে ঢুকেছিল কেন? বলতে বলতে আর একজন এলো, মোটর সাইকেল দাঁড় করাতেই আমি নেমে পড়লাম। তার কাছে গিয়ে বললাম- ভাই সাব বতাইয়ে না ধর্মজয়গড় হোকে কোরবা যায়েঙ্গে রাতমে যানা ঠিক হোগা কি নেহী? লোকটি বললো-আপলোগ যা সকতে হ্যা, লেকিন। আমি বললাম-লেকিন কেয়া? মাওবাদী হ্যায় কিয়া? বাঘ, ভালু, হাতী কুছ? -নেহী নেহী, উহ সব মত ডরিয়ে, হিঁয়াসেজঙ্গল শুরু হোতা হ্যায় আপটু ধর্মজয়গড়তক ইসকে বাদ হাতি তক পাহাড়ী রাস্তা (হাতি একটি জায়গার নাম) দেড়শো কিলোমিটার ইয়ে মার্গ বহুত খরাপ, আপকো লগভগ দশ ঘন্টা টাইম লগ যায়েঙ্গে। কথা শেষ করে গুগল ম্যাপ চালু করে বসে রইলাম সাহসী মৌলিক গাড়ি চালাতে লাগলো। ঠাকুরের নাম জপ করছিলাম সবার অজান্তে, কেবলমাত্র ঠাকুরই শুনতে পাচ্ছিল। আমি আর ড্রাইভার ছাড়া সবাই ঘুমাচ্ছিল। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ যেতেই শুরু হলো চড়াই উতরাই ঘন জঙ্গল। বড় বড় পাথর ফেলে রাস্তা তৈরী হয়েছিল কোন মান্ধাতা আমলে তা বলা মুশকিল। গুগল দেখাচ্ছে ওই রাস্তা অম্বিকাপুর হাইওয়ে মার্গ অথচ তার হাল। গাড়ির আলোয় যা দেখছিলাম তাতে মনে হচ্ছিল কি ভুলে এই রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি সকাল হবে তো! গাড়ি যেভাবে হেলেদুলে চলছিল চাকা ঘুরছে কিনা সন্দেহ হচ্ছিল। ঘুমানোর লোকগুলি কি করছিল তারাই জানে। রাত যখন একটা তখন দু ঘন্টা গাড়ি চলেছে রিডিং বলছে মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার গাড়ি গড়েছে। এখনো পর্যন্ত কোন ঘর কোন আলো কোন বাহন দেখা যায় নি। হঠাৎ মৌলিক গাড়ি ডানদিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো, দেখলাম ওটি একটি পাম্প কিন্তু কোনো আলো নেই। মৌলিক নেমে পড়লো সামনে একটা ট্যাবকলে চোখে মুখে জল দিয়ে আবার গাড়িতে উঠলো। আমি বললাম-তুই যে এখানে দাঁড়ালি এখানে আলো নেই কারেন্ট নেই মানুষ নেই যদি কোন বিপদ হয়? পরিত্যক্ত পাম্প হতে পারে? অভিজ্ঞের মত মৌলিক বললো-না কোন ভয় নেই। নেবে হাত মুখে জল দিয়ে পেচ্ছাপ সেরে নিন। মৌলিকের কথায় সাহস পেয়ে সবাই নেবে গাড়ির ক্ষীণ আলোতে সবাই বড় একটি পাথরের পাশে বাথরুম সারলাম। মৌলিক আবার গাড়ি চালাতে লাগলো। রাস্তা শুনশান খুব ভয় করছিল কি জানি কি হয়! ত্রিশ কিলোমিটার যাওয়ার পর হঠাৎ রাস্তার ধারে একটা ঘরে টীম টিম করে একটা বালব জ্বলছে বাইরে। মনে খুব আনন্দ হলো ইলেকট্রিক তাহলে আছে। গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে পড়লাম। তাল পাতার ছাউনি দেওয়া একটি লাল মাটির ঘর বাইরের থেকে তালা দেওয়া। নিরাশ হলাম। তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে মৌলিককে বললাম- চল,এখানে এক মুহূর্ত নয়। মৌলিক চললো, গাড়ি যেন পেছন থেকে কেউ টেনে রেখেছে। মোবাইলে টাওয়ার নেই। অফলাইনে বুঝলাম জায়গার নাম ধর্মজয়গড়। গাড়ির মিটার বলছে একশো কিলোমিটারের কাছাকাছি চলে এসেছি। সময় রাত তিনটা। আবার বিপদ, গাড়ির আলোয় দেখলাম দুটি কালো চোখে আলো জ্বলছে সে যেন তীব্র গতিতে গাড়ির দিকে ছুটে আসছে। কালো বিশাল আকৃতির এক জানোয়ার। মৌলিক গাড়ির ষ্টার্ট বন্ধ করে সাইট করেছে। হেড লাইট জ্বলছে। এমনি বিশালাকার জন্তুটি কি হাতি হতে পারে! না হাতি না, ঝড়ের মত লাফাতে লাফাতে ছুটে এসে গাড়ির সামনে দিয়ে পাশের জঙ্গলে ঢুকে গেল। সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। একটা বিশালাকৃতির ভালুক যা কোনদিন দেখিনি। আমাদের কে সতর্ক করে গেল। বন দপ্তরের সাইনবোর্ডে সতর্কিকরণ যথাযথ প্রমাণিত হল। আর ঘন্টা খানেক পরে ভোর হবে। চার পাঁচ কিলোমিটার যেতেই রোড ক্লোজড সাইন, মৌলিক নেবে দেখলো বিশাল পাহাড়কে কভার করে একটি নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে। ওখানেই ঝাড়খণ্ড বর্ডার এরপর ছত্তিসগড়ে ঢুকবো। মৌলিক কোনোভাবে সংকীর্ণ রাস্তা দিয়ে গাড়িকে বার করলো। ছত্তিসগড়ের সীমানায়। একঘন্টা লাগলো ওই জায়গা পার করতে।এইবার ছত্তিসগড়ের অম্বিকাপুর হাইওয়ে সত্যিকারের হাইওয়ে বলে মনে হলো। আলো ফুটছে, সকাল হচ্ছে। মনে মনে ঠাকুর কে আর একবার ধন্যবাদ জানিয়ে মৌলিকের পিঠ চাপড়াতে চাপড়াতে বললাম – তুই আমার ছেলে। বাবা মার জীবনের দায়িত্ব তোর হাতে দিয়ে কোন ভুল করিনি। সকাল ছটা নাগাদ হাতি ঢুকে গেলাম। সকালে সবাই নেবে দোকানে চা বিস্কুট খেয়ে হাতি থেকে কোরবা পঞ্চাশ কিলোমিটার বাকীপথ আটটায় কোরবা মেয়ের বাড়ি পৌঁছে গেলাম। এরপর যতবারই গাড়ি নিয়ে ছত্তিসগড় গিয়েছি ওই পথে আর যাইনি।
আজ থেকে সতেরো বছর আগে ঘটেছিল এক ঘটনা যা এখনও আমার মনকে উদ্বেলিত করে।
আমার তিন মেয়ে সোনা রুপা দীপা। আমার পাশের গ্রামের এক বন্ধুর ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলাম মেজো মেয়ে রূপালী কে। বন্ধু চাকরি সুত্রে ছত্তিসগড়ের কোরবায় থাকতো। সাউথ ইষ্টার্ন কোল লিমিটেডের ডাম্পার অপারেটর ছিল সে। এস ই সি এল এর কোয়ার্টারে থাকতো তার পরিবারকে নিয়ে। আমার জামাই ওখানকার লায়ন্স হাইস্কুলের ইংলিশের শিক্ষক। বিয়ের পরে প্রতি বছরই কোরবা যাতায়াত। সাড়ে সাতসো কিলোমিটার যাত্রা পথ কখনো ট্রেন কখনো নিজের গাড়িতে। ওড়িশা ছত্তিসগড়ের রাস্তার মনোহারিণী দৃশ্য দেখতে দেখতে যাত্রাপথ অত্যন্ত সুন্দর স্বচ্ছন্দময় হয়ে ওঠে তা অবর্ণনীয়। আবার ওড়িশা ঝাড়খন্ডে ছত্তিসগড় মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান যেমন অমরকণ্টক ফরেষ্ট রেঞ্জ, কেওনঝড় ফরেষ্ট রেঞ্জ, টাটা ষ্টীল কারখানা ইত্যাদি।
যতই বলিনা কেন কারে যাওয়ার সময় একবার একটি বিপদ ছত্তিসগড় ও ঝাড়খন্ড বর্ডারে ঘটেছিল,আবার ট্রেনে খড়্গপুর থেকে বিলাসপুর যাওয়ার পথে একটি বিপদ ঘটেছিল যা রীতিমতো রোমহর্ষক রোমাঞ্চকর বলা যেতে পারে। দুহাজার সাত সালে ছত্তিসগড় মানে মাওবাদীদের স্বর্গরাজ্য।
এরকম একটা সময়ে খড়্গপুর থেকে ট্রেনে মুম্বাই এক্সপ্রেসে টিকিট না পেয়ে ইস্পাত এক্সপ্রেসে ঝাড়সুগুড়া পর্যন্ত সকাল আটটায় দিনের দিন টিকিট কেটে উঠে পড়লাম। আমি আমার স্ত্রী মেয়ে ও তার কোলের বাচ্চা। আমাদের যেতে হবে ছত্তিসগড়ের চাঁপা বলে এক ষ্টেশন, সেখান থেকে কোরবা আমার মেয়ের বাড়ি। বোম্বে লাইনে রায়গড়ের পরে বিলাসপুর এর আগে এই চাঁপা ষ্টেশন। ঝাড়সুগুড়া রায়গড়ের একশ পঞ্চাশ কিলোমিটার আগে একটি ষ্টেশন। মোবাইলে রেলওয়ে গাইড থেকে জানতে পেরেছিলাম ইস্পাত এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটা লিংক প্যাসেঞ্জার ট্রেন ঝাড়সুগুড়া থেকে বিলাসপুর যায় বিকেল চারটায়, রাত সাড়ে নটায় চাঁপা পৌঁছায়। বিকেল তিনটে নাগাদ ইস্পাত ঝাড়সুগুড়া ঢুকে যায়। ইস্পাত এক্সপ্রেসের লাষ্ট ষ্টেশন সম্বলপুর। ঝাড়সুগুড়া বিলাসপুর প্যাসেঞ্জার মধ্যবর্তী ষ্টেশন গুলোতে সবটাতেই দাড়াঁয়। ইস্পাত আমাদের ঝাড়সুগুড়া ষ্টেশনে নামিয়ে দিল। আমরা ষ্টেশনে একটু ফ্রেস হয়ে অপেক্ষমাণ ঝাড়সুগুড়া বিলাসপুর প্যাসেঞ্জারে টিকিট কেটে উঠে পড়লাম। গাড়ি ছাড়বে চারটায়। গোটা ট্রেনটা বগি টু বগি ঘুরে দেখলাম একটি ও মানুষ এই গাড়িতে উঠছে না। কাউকে ও আগে থেকে বসে থাকতে দেখলাম না। তা হোক, আমরা চারটি প্রানী একটা বগিকেই নিজের ঘর হিসাবে ধরে নিলাম। মালপত্র সব বাংকে তুলে এক একটা বার্থকে এক এক জনের শোয়া বসার জন্য ব্যবহার করলাম। ষ্টেশনের টিকিট কাউন্টারে আবার খোঁজ নিলাম আমরা সঠিক ট্রেনে উঠেছি কিনা! ট্রেন কনফার্ম। প্যাসেঞ্জার ট্রেন সীট বা বার্থ কনফার্মের বালাই নেই। ঘড়িতে চারটা বাজলো ট্রেন ছাড়ার নাম নেই। সাড়ে চারটার সময় ঘোষণা হলো ‘ যাত্রিগন কৃপয়া ধ্যান দেঁ ,চার বজকর পঁয়তিশ মিনিট পর ঝাড়সুগুড়া রায়গড় চাঁপা বিলাসপুর যানে ওয়ালী গাড়ি দো নম্বর প্লাটফর্ম সে ছুটেগী।’ ছাড়লো কিন্তু কেউ আর উঠলো না। আমরা চলেছি। আন্দাজ পঁচিশ ত্রিশটা বগি তে কোনো মানুষ নেই। প্রতি ষ্টেশন ধরিয়ে গাড়ি চলছে, কোনো কোনো ষ্টেশনে পাঁচ দশ মিনিট দাঁড়িয়েই থাকছে।বিরক্তির শেষ নেই। ঝাড়সুগুড়া থেকে রায়গড় সত্তর কিলোমিটার চার ঘন্টার ও বেশি সময় লাগলো। রাত আটটা হয়ে গেল। রায়গড় ষ্টেশনে দু একজনকে ট্রেনে উঠতে দেখা গেল। তবে আমাদের বগিতে কেউ উঠলো না। পনের কুড়ি মিনিট পর ট্রেন ছাড়লো। চাঁপায় পৌঁছানোর টাইম নটা তিরিশ। আরও নব্বই কিলোমিটার এই গাড়ি আজ রাতে চাঁপায় যাবে তো! রায়গড় ছেড়ে কয়েকটা ষ্টেশন পরে দেখা গেল বিশাল বিশাল লকড়ির বোঝা নিয়ে বুড়ি ছুঁড়ি মেয়েরা দরজার মুখটা কে বন্ধ করে মেঝেতে বসে রইলো। নাকে নোলক, কে বুড়ি আর কে ছুঁড়ি বোঝা দায় কালো চেহারার সব যেন এক। মনে মনে ভাবছি এরা মাওবাদী দের মা বউ মেয়ে কেউ হবে! এসব ভাবলে কি হবে? ভেতর টায় কিছু তো হচ্ছে? জানলা দিয়ে চোখ বাড়িয়ে দেখলাম গোটা ট্রেনের বগির দরজা কাঠের বোঝা দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। কোন ষ্টেশনে নেমে একটু যে দেখবো তার কোন উপায় নেই। রাগও হচ্ছে। গেটের কাছে উঠে গিয়ে এক বুড়িকে বললাম – মা জী হামলোগ কেয়সে উতরেঙ্গে?
কোনো জবাব নেই। আপন মনে বসে রইল। কি জানি আমার কথা বুঝলো নাকি আরও জেদ চাপলো বোঝা গেল না। আমার আর কিছু করার নেই। বোধহয় চাঁপা তে নামতে পারবোনা। বড় দুশ্চিন্তা মনে। রাত প্রায় দশটা, জঙ্গল এলাকা ষ্টেশন গুলিতে এক আধটা লাইট কোথাও জ্বলছে আবার কোথাও নেই। হঠাৎ একটি ষ্টেশনে ট্রেন দাঁড়াতেই সব কাঠওয়ালী অনায়াসে বোঝা টেনে নিয়ে কেঁচর মেঁচর করতে করতে নেমে গেল। অবাক কান্ড ট্রেন ছাড়তে দেখা গেল আমরা ছাড়া ঐ ট্রেনে সম্ভবত আর কেউ নেই। ষ্টেশনের নাম ছিল শক্তি। আর বেশী ষ্টেশন বাকী নেই গোটা পাঁচেক ষ্টেশন পরেই আসবে চাঁপা। এতক্ষণ ছত্তিসগড়ের ঘন ঘোর জঙ্গলে র মধ্য দিয়েই ট্রেন চলছে। ষ্টেশন গুলিতে আলো নেই। অন্ধকার ভেদ করে ট্রেন যাচ্ছে। জনমানবশূন্য এইসব জায়গায় কেন যে ষ্টেশন করা হয়েছে বলা মুশকিল। ভেতরে মাওবাদীর গল্প উঁকি দিচ্ছে। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে চলেছি। কখন যে আলো ঝলমল সেই চাঁপা জংশন আসবে?
মেয়ে হঠাৎ বলে উঠলো-বাবা এসে গেছি। তাড়াতাড়ি ব্যাগপত্র বাংক থেকে টানাটানি করে দ্রুত নেমে পড়লাম। ট্রেন মুহূর্তে র মধ্যে ছেড়ে দিল। নেমেই বুঝতে পেরেছি এটা চাঁপা জংশন নয়। অন্ধকারে পায়ে অনুভূতি হচ্ছে মোরাম ও ঘাসের প্লাটফর্ম। আর কোনো উপায় নেই। আমরা যে ভুল করেছি তার সংশোধন হবে না। মেয়ে আমার যেন পাথর হয়ে গেছে। কারো মুখে কোন কথা নেই। শীতের রাত কারা যেন আগুন জ্বালিয়ে প্লাটফর্মের উপর রান্না করছে। ষ্টেশনে ডিসপ্লে বোর্ডের কাছে গিয়ে দেখলাম ঐ ষ্টেশনের নাম বারোদোয়ার। আশ্চর্য ষ্টেশনে প্লাটফর্ম নেই। আলো নেই। টিকিট কাটার ঘর আছে মানুষ নেই। আমরা এখানকার স্থানীয় এইটা বোঝাতে ওদের কাছে কিছু জানতে না চেয়ে টিকিট ঘরটার দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম পরিত্যক্ত টিকিট ঘর। হঠাৎ একজন রাইফেল ধারী পুলিশ সামনে এসে দাঁড়ালো। রেলওয়ে পুলিশ বলে মনে হলো। আমাদের অসহায় অবস্থা বুঝতে পেরেছে বোঝা গেল। সে বললো – যোভী ইয়ে ভুল করতা উয়ো বাপস্ নেহী যা সকতা।
আপকো কাল রাত তক হিঁয়াহী ঠারনা পড়েগা। অর কোই গাড়ি ইস ষ্টেশন মে খড়ি নেহী হোগী। হামারা ডিউটি স্রিফ ইস টাইম ইয়ে গাড়িকে লিয়ে।আপলোগ এক কাম কিজিয়ে। হিঁয়া সে তিন কিলোমিটার দুর লোকল থানা মিলেগা হিঁয়া রিপোর্ট লিখাইয়ে।
বলেই ঢালুতে নেবে চলে গেল। যাই হোক মেয়েই আমাকে নেমে পড়তে বললো তাই নেমে পড়লাম। মেয়েরই দোষ সেতো মরমে মরেই আছে। মুখে কোন ভাষা নেই। রাত এগারোটা এই বুঝি মাওবাদী ধরলো। মোবাইলে টাওয়ার নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। মেয়ে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে দুটো বড় ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। আমি ও দুটো অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তিন কিলোমিটার থানার দিকে রওনা দিলাম। থানায় যাওয়া কি ঠিক হবে? অনেক প্রশ্ন মনে। খানিকটা এগোতে দেখলাম কজন মোমবাতির আলোর মত কিছু জ্বালিয়ে কি যেন করছে! ভালো দেখা যাচ্ছিল না একজন আমাদের দিকে আসছে মনে হলো। মেয়ে বললো আর ওদিকে যাবো না, এদের বিশ্বাস হচ্ছে না, মাওবাদী মনে হচ্ছে, চল সেই ষ্টেশনে গিয়ে বসে থাকি যা হয় হবে। আমি কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। একটি লোক আমাদের কাছে এসে বললো, কি বললো বুঝতে পারলাম না। আমাদের কে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইছে মনে হলো। আমার স্ত্রী বললো না খবরদার যাবে না। সে নাছোড়বান্দা আমার হাত ধরে টানতে আরম্ভ করলো। মেয়ে সেখানে মোরামের উপর বসে পড়লো। আমার স্ত্রী আমার হাত ধরে টানতে লাগলো। আমি খুব জোর রেগে গেলাম। যা করে হোক বাংন্দী ভাষায় সে কি চাইছে তার সঙ্গে একটু কথা বলার চেষ্টা করলাম।
হামলোগ হামারা জানা পহচানাকে পাশ যায়েঙ্গে।
সে তখন ছত্তিসগড়ি ভাষা থেকে হিন্দি তে আসার চেষ্টা করলো। বললো-হীঁয়াসে বাসষ্ট্যান্ড পাঁচ কিলোমিটার দুর। কেয়সে যায়েঙ্গে ? হামারা সাথ চলিয়ে।
আমাদের বড় ব্যাগটা সে কাঁধে নেওয়ার চেষ্টা করতেই মেয়ের সঙ্গে প্রায় ধস্তাধস্তি আরম্ভ হয়ে গেল। বেগতিক দেখে আমি রেগে গিয়ে ওই লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলাম। ব্যাগটা ছেড়ে দিয়ে নিজের মনে মনে গজগজ করতে করতে সে কেটে পড়লো। এত অন্ধকার যে কোনো কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ভয়ে মোবাইলের আলোও জ্বালছি না। পাহাড়ি রাস্তায় কি জানি কি হয়, ভয়ে ভয়ে আমরা উঁচুটার দিকে এগোলাম, হঠাৎ দেখি ঝোপের পাশ থেকে একজন এগিয়ে এলো। খুব ভয় পেয়ে গেলাম. সামনে আসতেই দেখলাম একটি সন্ডা গন্ডা লোক. ও জানতে চাইলো আমরা কোথায় যাব। কোন উপায়ান্তর না দেখে বললাম – বাস স্ট্যান্ড জানা হ্যায়। ও বললো – উয় যো পাহাড় দিখ রহা হ্যায় উধারমে। বলেই একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে গেল। উপায়ান্তর না দেখে আমরা চলতে লাগলাম। খানিক পরে আমরা একটি গাছের তলায় এলাম। আর হাঁটতে পারছি না। মেয়েটা খুব কষ্টে হাঁটছিল। যাই হোক দেখলাম একটা পান দোকান নম্ফ জ্বেলে বসে আছে। আর একটু দুরে জনা চারেক একটা নম্ফ জ্বেলে তাস খেলছে।রাত সাড়ে এগারোটা। গাছের গোড়ায় ব্যাগ রাখতেই। দোকানি বলল-উঁহা মত রখিয়ে। মুশকিলে পড়লাম। নিচে তাকাতেই বুঝলাম গাছের উপরে বক আছে। গোটা গাছের গোড়ায় সাদা পায়খানায় ভরে আছে। সব ব্যাগগুলি সরিয়ে আবার দোকানদারের সামনে রাখলাম। প্রচন্ড টেনশন মাথায় নিয়ে একটি পান খেতে চাইলাম। সে পান দিল। এবার জানতে চাইলাম বাসস্ট্যান্ডে বাস কখন আসবে। সে বললো -কাল শুভা আট বজে। মাথায় যেন বাজ পড়লো। বিশাল বড় পানটা নিয়ে মুখে পুরে দিলাম। খিদায় পেট চোঁ চোঁ করছে। পানটা খেয়েই সান্তনা। সবাই আগ্রহ নিয়ে আমাদের দিকে দেখছে। কি আর করি! প্রচন্ড টেনশন নিয়ে পান চিবিয়েই চলেছি। আমার স্ত্রী ব্যাগ থেকে কিছু খাবার বার করল। ওরা দুজনে খেতে আরম্ভ করলো। মাওবাদীরা কি এমনি হয় কিছু ওদের কথা তখন মাথায় আসছে না। ভাবছি কি এখন করব। হঠাৎ দেখি একটি মোটরসাইকেল আসছে। মোটরসাইকেলটি এসে দাঁড়ালো আমরা কে জানতে চাইল। আলো-আঁধারিতে দেখলাম মোটরসাইকেলে প্রেস লেখা আছে। মনে মনে খুব ভরসা পেলাম। তা হলেও টেনশন কমেনি, পানটা তখনো চিবিয়েই চলেছি। পানটার মধ্যেই যেন সর্ব সুখ লুকিয়ে আছে। একটি কুড়ি বাইশ বছরের ছেলে মোটরসাইকেল থেকে নেমে জিজ্ঞেস করল। মেয় প্রেস কা আদমী।থানা সে খবর মিলা। বলিয়ে আপলোগকো ক্যায়সে হেল্প কর সকতা হুঁ। বিশ্বাস ও ভরসা দুটি পেলাম। সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। আমার প্রেস কার্ড দেখালাম। সে থাকার জন্য ঘর ব্যবস্থা করে দেবে বলল। আমি বললাম -কোরবা যাওয়ার জন্য গাড়ি পাওয়া যাবে কিনা। কোরবা সেখান থেকে প্রায় ষাট কিলোমিটার। সে একটা কার্ড আমার হাতে দিল। বললো -আপলোগ ইধারই ঠারিয়ে হম দেখতে হ্যায়। বলে মোটরসাইকেল নিয়ে চলে গেল। পান তখনো চিবিয়ে চলেছি। ১৫-২০ মিনিট পরে আবার সে ফিরে এলো এসে বলল দু হাজার টাকা লাগবে। আমি বললাম ঠিক আছে । গাড়ি কে ফোন করে আসতে বললো। সেই সময়ের মধ্যে আমার সমস্ত তথ্য সে জেনে নিল। গাড়ি এলো আমরা গাড়িতে উঠে পড়লাম। ভয় তো কাটছে না। সে গাড়ি আবার কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায়। ছেলেটার নাম আকতি নিষাদ। না আর কোন অসুবিধা হয়নি পৌঁছেই আকতি নিষাদকে ফোন করে পৌঁছানোর সংবাদ দিয়ে দিলাম। রাত তখন একটা। পরের দিন ছত্রিশগড়ের একটি পেপারে দেখলাম আমাদের এই খবরটা বেরিয়েছে। জামাই এনে দেখালো। আসল কথাটা বলতে হবে। যে পানটি আমি খেয়েছিলাম সেটা শাল পাতায় মোড়া ছিল ওর মধ্যে একগাদা চুন ছিল । ওই শাল পাতা শুদ্ধ আমি খেয়েছি। চার থেকে পাঁচ দিন কিছু খেতে পারলাম না। মুখে ঘা হয়ে গেল। বিপদ যখন আসে ভুলের মাশুল গোনা শুরু হয়ে যায়।


