
নাটিকা
নাটিকা
“ভেদাভেদ “
নাট্যকার- সুধাংশু শেখর রাউৎ (রত্নাকর রায়)
চরিত্রগুলিঃ-
বিমল ব্যানার্জী- বয়স ৪০ ব্যাংকের ম্যানেজার
বিমলা – বয়স ৩৬ বিমলের স্ত্রী ।
সৌরভ- বয়স ৭ ছেলে ডাকনাম শুভ।
কল্যানী – বয়স ২৫ কাজের মেয়ে ডাকনাম কলা
ফকির- বয়স ৬০ ভিখারী
মাষ্টার-বয়স ৪৫ স্কুলের শিক্ষক
শশী -বয়স ৪০ হাতুড়ে ডাক্তার
বাদশা-বয়স ৩০ হাসপাতালের সরকারী ডাক্তার।
নার্স- রোগী – ইত্যাদি।
১ম পর্ব-
(ঘরের মধ্যে বিমলা জিনিস পত্র গোছাতে ব্যস্ত কল্যাণী ঝাঁট দিতে ব্যস্ত)
বিমলা – তোমার ওই ঠিকার কাজ আমার পছন্দ হয়না।
কলা-গিন্নী মা আপনি তো আমার সব কাজেই দোষ ধরেন।
বিমলা -সাধে কি আর বলি? কথায় কথায় উত্তর, তোর মত মেয়েরা সব পয়সা চেনে কাজ চেনে না।
কলা -কাজই তো করছি মা, বাবু তো কোনদিন রা করে না, বরং প্রশংসাই করে।
বিমলা -সে কথা বলতে, কথায় আছে না আপেল ফেলে আম।
কলা -আসলে আমরা গরীব ছোট লোক তাই এত ঘেন্যা।
বিমলা -আর না, ছোট মুখে বড় কথা, হাজার টাকা মাইনা দিয়ে হাত পোড়াই , তুই আমার মুখ পোড়াস্। কটা বাজলো সে খেয়াল আছে? বাচ্চাটা স্কুলে একলা দাঁড়িয়ে থাকবে না!
কলা -যাচ্ছি মা। (চলে গেল)
বিমলা – কোথায় এসে পড়েছি রে বাবা! এই অজ পাড়াগাঁয়ে ব্যাংক! কপাল মন্দ তাই শহর থেকে গ্রামে এসে জেলবন্দী , সারাদিন ভিখারীর শেষ নেই, চারদিকে বস্তি। কার কত পয়সা আছে যে সরকার এরকম একটা ব্যাংক এই গ্রামে খুলে রেখেছে?
(ফকিরের প্রবেশ)
ফকির -আল্লা দোয়া করবে মা, দুটি ভিক্ষা দাও গো মা।
বিমলা -মুসলমান ফকির!
ফকির – মা, দুটি ভিক্ষা দাও মা।
বিমলা – খবরদার, খবরদার ভেতরে পা রাখবে না ম্লেচ্ছ, নোংরা মুসলমান ছোট জাত।
ফকির – মা -মাগো, জাত ধর্ম তুলে কথা বলছো কেন মা? আমরা সবাই মানুষ গো মা, তোমার রক্ত আমার রক্ত এক। তুমি হিন্দু আমি মুসলমান যে যার যে ধর্ম। সব ধর্ম সমান। তফাৎ একটাই তুমি আমীর আমি গরীব।
বিমলা – ওসব অনেক কথা আমি জানি। এখনই এখান থেকে বিদেয় হও নইলে-।
ফকির – নইলে কি করবেন মা? ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দেবেন?
বিমলা – হ্যাঁ তাই দেবো।
ফকির -না তার আর দরকার নেই।আমি আর কোনদিন আপনার ঘরে আসবো না। হায়রে আল্লাহ। পীরের কি মহিমা।
(বিমলের প্রবেশ)
বিমল -কি হলো কি!
বিমলা – দেখই না, ভিখারীর আবার কেমন চ্যাটাং চ্যাটাং কথা। জোয়ান লোকটা গতর খাটাতে পারে না ভিক্ষা করে! আগে তুমি ওকে বার কর।
বিমল – কি বলছো! বৃদ্ধ মানুষ কে জোয়ান বলছো? দাঁড়াও ফকির সাহেব। (মানিব্যাগ থেকে একটি দশ টাকার নোট বার করে) এই নাও ফকির সাহেব। (বলেই ফকিরের হাতে গুঁজে দিল)
ফকির – আল্লার কসম সাহেব এই টাকা আমি নিতে পারবো না। গিন্নী মা আমায় অনেক কটু কথা বলেছেন। গালাগাল দিয়েছেন। আমার জাত ধর্ম তুলে অনেক গালমন্দ করেছেন। এই টাকা নিলে আমার অধর্ম হবে। (সাহেবের হাতে আবার টাকা টি ফেরত দিয়ে) খোদা সবাই কে মাপ করেন। (প্রস্থান)
বিমলা – খোদার বাচ্চা, যত সব নরকের কিট, পাপী।
বিমল – পাপ পূন্য বিচার করার তুমি কে? মানুষ হয়ে জন্মেছ পাপ পূন্যের বিচার ভগবান করবেন। ধনী গরীব জাত ধর্ম ভেদাভেদটাও তোমার জানা নেই। চিরকাল তুমি জাত ধর্ম তুলে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখলে।
বিমলা -কথা বাড়িয়ো না। একটা কথা মনে রেখো মুসলমানের ছোঁয়া ঐ টাকা তুমি যদি গঙ্গা জলে পবিত্র না করে পকেটে ঢোকাও তাহলে আমার চেয়ে দুশমন আর কেউ হবে না।
বিমল – একমাত্র আমার দুশমন তুমিই আছ থাকবে। তোমার বাপ তো বাংলাদেশের একজন, কে বলতে পারে তোমার মধ্যে হিন্দু না মুসলমানের রক্ত?
বিমলা – ফের সেই বাপ তুলে কথা! (নাকি কান্না) ও বাবা গো। নিজের মানুষ সে কি বলে!
সারাটা দিন গাঁয়ের আনপড় মূর্খদের সঙ্গে বাস করছি। মেশার কোন উপায় নেই। কথা বলার একটা লোক নেই, তার উপর বস্তির ভিখারীদের সঙ্গে দিনভর বকমবাজী আর আমি সইতে পারছি না।
হ্যাঁ গো সাহেব ,-ছেলেটা এখনো স্কুল থেকে এলোনা একবার খোঁজ খবর নেবে—-?
বিমল – তুমি খোঁজ নিতে পার তো?
বিমলা -ওই স্কুলে আমি যাবো?
বেআক্কেল মাষ্টার সব। স্কুল ছুটি হলেই যে যার ঘর। কোন বাচ্চার কি হলো না হলো তাদের কি যায় আসে? এ সবের হুঁশ নেই।
(বাচ্চাকে নিয়ে কল্যানীর প্রবেশ)
বিমল- এত দেরী কেন?
কলা – দাদাবাবু আমি স্কুলের গেটে শুভর অপেক্ষায় বসেছিলাম। ভাবছি শুভ এবার বেরোবে। সব মাষ্টার, সব ছাত্র যখন চলে গেল শুভকে দেখতে না পেয়ে আমি ভেতরে ছুটে গেলাম, তখন মালি দরজায় তালা দিচ্ছিল, শুভ যে ঘরে বসে দেখি সেই ঘরের তালা বন্ধ। তাড়াতাড়ি মালিকে ডাকলাম, অনেক করে বলতে সে তালা খুললো। আমি ভেতরে ঢুকে দেখি শুভ বেঞ্চের উপর শুয়ে আছে। আমি মালিকে খুব বকা দিলাম। সে আমাকে বললো কাউকে এ কথা বলতে না।
বিমল- সেকি!
বিমলা – দেখলে তো, পই পই করে বারন করেছিলাম ওই স্কুলে দিওনা। শহরের ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি কর, কথাটা শুনলে আমার?
(শুভ জ্বরে কাঁপছিল বিমলা তার গায়ে মাথায় হাত দিয়ে দেখে প্রচন্ড জ্বর শুভকে শুইয়ে মাথায় জল পট্টি দেয়)
কি সর্বনাশ হলো গো, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, কি করি কোথায় যাই।
বিমল – কই দেখি, বিমলা তুমি একটু স্থির হও, জ্বরই তো হয়েছে। ও ঠিক হয়ে যাবে।
বিমলা – তুমি কি যাদু জান নাকি, আমার বাচ্চাকে ঠিক করে দেবে?
বিমল – বাচ্চা তো আমার ও তুমি একটু চুপ কর।
কল্যানী তুমি পাশে কোন ডাক্তার আছে নাকি ডেকে আনতে পারবে?
কলা – শশী ডাক্তার আছে, ডেকে আনবো?
বিমল -হ্যাঁ – তাড়াতাড়ি যাও।
(কলা চলে গেল)
বিমলা -স্কুলের মাষ্টাররা আমার বাচ্চাকে তালা লাগিয়ে চলে গেল! এরা মাষ্টার না জল্লাদ! কাউকে আমি ছাড়বো না। থানায় যাবো,ওদের বিরুদ্ধে মামলা করবো।
বিমল – হে ভগবান কোথায় এসে পড়লাম রে বাবা, এরকম জানলে প্রমোশন নিতাম না।
শুভ – একটু জল খাবো মা।
বিমলা – দিচ্ছি বাবা, এই নাও। (মুখে জল দিল। দুজন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে)
শুভ- আমার দুই বন্ধু ও অসুস্থ ওদের হাসপাতালে ভর্তি করেছে।
বিমলা- অজ গাঁয়ে তার আবার হাসপাতাল। না বাবা তোমাকে এখানকার হাসপাতালে ভর্তি করবো না। দরকার হলে কোলকাতায় নিয়ে যাবো।
(কলা ডাক্তার কে নিয়ে ঢুকলো)
বিমল – ডাক্তার বাবু দেখুন না। স্কুলের থেকেই জ্বর দয়া করে একটু দেখুন না।
ডাক্তার- আপনারা কোন চিন্তা করবেন না, এসময় এরকম হয়ে থাকে, ঘর ঘর এই অবস্থা, (থার্মোমিটারে পরীক্ষার পর) একশো দুই জ্বর, চিন্তা করবেন না ঠিক হয়ে যাবে।
দরকার হলে হাসপাতালে ভালো একজন নতুন ডাক্তার এসেছে। মনে সাহস রাখুন।
এই ওষুধ গুলো লিখে দিলাম। সকাল দুপুর সন্ধ্যা খাওয়াবেন, সারাদিনে তিনবেলা পেঁপে পাতার রস খাওয়াবেন। জ্বর থাকলে মাথায় জল পট্টি দেবেন।
বিমল- (এগিয়ে দিতে দিতে) ডাক্তার বাবু কেমন দেখলেন?
ডাক্তার-ভয়ের কোন কারন নেই। সেরে যাবে।
(ডাক্তার চলে গেল বিমলা আনমনে শুভর মাথার কাছে ও বিমল চেয়ারে বসে রইল আলো নিভে গেল)
( তিন দিন পর। পর্দা উঠলে দেখা গেল একই অবস্থা ডাক্তার ঢুকলেন)
বিমল-ডাক্তার বাবু -আসুন।
বিমলা-(কান্না ) ডাক্তার বাবু কিছু একটা করুন। তিন দিন জ্বর যাচ্ছে আসছে একশো র নীচে জ্বর নামছেই না। দিন দিন বাচ্চা আমার ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।
ডাক্তার- বৌদি এত চিন্তা করছেন কেন? দেখছি। (পরীক্ষার পর) বাচ্চার রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে। আপনি এক কাজ করুন, একবার হসপিটালের ডাক্তার কে দেখিয়ে নিন। আমি শুধু পেরাসিটামল ট্যাবলেট লিখে দিয়ে যাচ্ছি, পেঁপে পাতার রস, সেইসঙ্গে রোগিকে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খাওয়াবেন। ঘরের চারদিকে কোথাও জল জমতে দিবেন না। আমি এখন আসছি। সময় মত খবর দিলেই চলে আসবো। (প্রস্থান)
বিমলা-এখন কি করবে? এখানকার হাসপাতাল! ভালো ডাক্তার আছে কি নেই! বরং শহরের কোন বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ভালো হয়।
বিমল- অত ভাবছো কেন? দরকার হলে তাই করবো। শশী ডাক্তার বললো তো এখানকার হাসপাতালে নতুন পাশ করা ডাক্তার এসেছে। নাকি খুব ভালো ডাক্তার। আর দেরী নয় চল তাড়াতাড়ি নিয়ে যাওয়ার ব্যাবস্থা করি।
বিমলা- হ্যাঁ তাই চল।
২য় পর্ব-
(পর্দা উঠলে দেখা গেল হাসপাতালের পরিবেশ -দুজন রোগী শুয়ে এক নার্স দাঁড়িয়ে ডাক্তার চেয়ারে বসে বিমল তার স্ত্রী ও ছেলের প্রবেশ)
বিমল- নমস্কার ডাক্তার বাবু।
ডাক্তার- নমস্কার। বলুন।
বিমল- আমার ছেলেটার আজ তিনদিন জ্বর। কিছুতেই সারছে না। এক হাতুড়ে ডাক্তার দেখছিল।ছেলে কিছু খেতে পারছে না। এই তার প্রেসক্রিপশন।
ডাক্তার-হুঁ। শশী ডাক্তার?
বিমল- হ্যাঁ।
ডাক্তার-ঠিক আছে। রক্ত পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে। নার্স..বাচ্চাটার রক্তটা নেওয়ার ব্যবস্থা কর।
দেখি খোকা, তোমার নাম কি?
শুভ-সৌরভ ব্যানার্জী।
ডাক্তার- কোন ক্লাসে পড়?
বিমলা-ক্লাস সিক্স। জানেন ডাক্তার বাবু এখানকার স্কুলগুলোতে ভীষণ নোংরা পরিবেশ। বাচ্চাদের মোটেই কেয়ার নেয় না।
বিমল- আহা তুমি থাম না। ডাক্তার বাবু যা জানতে চাইছেন সৌরভ বলুক না।
ডাক্তার- তোমার বয়স কত?
শুভ- সাত।
ডাক্তার-সাত কি?
বিমলা- সাত বছর।
শুভ- আমি ইঞ্জেকশন নেবো না।
ডাক্তার-কে ইঞ্জেকশন দিচ্ছে তোমায়?
এই যে নার্স মেমকে দেখছো ও কোনোদিন কাউকে ইঞ্জেকশন দেয় না।
ডাক্তাররা ইঞ্জেকশন দেয়। শুধু আদর করে একটা রাবার তোমার হাতে জড়িয়ে দেয়।
আমার দিকে তাকাও।
এটা কি বলতো?
শুভ- মোবাইল। (এই সময় নার্স রক্ত নিয়ে নিল)
ডাক্তার- এটা কি মোবাইল?
বিমল-ডাক্তার বাবু। ছেলে আমার মোবাইলে ওস্তাদ।
ডাক্তার- তাইতো আপনাদের আর কাউকেই কষ্ট পেতে হলো না। জ্বর আছে। নার্স ওকে শুইয়ে সেলাইন দিয়ে দাও। আর সেম্পলটা এখুনি পাঠিয়ে দাও।
(নার্স শুভকে শুইয়ে দিয়ে চলে গেল)
ডাক্তার- স্যার, আপনি কি করেন? বিমল- আমি বিদ্যাপীঠের ব্যাংক ম্যানেজার। ওখানে পাশেই ঘর ভাড়া নিয়ে আছি।
বিমলা- ডাক্তার বাবু ছেলের জন্য আমি এক বোতল জল কিনে নিয়ে আসি।
ডাক্তার- কি দরকার। হাসপাতালের জল খুব ভালো। বাজারের ওইসব জল না খাওয়াই ভালো।
বিমল- ডাক্তার বাবু কিছু মনে করবেন না আপনার নাম?
ডাক্তার- বাদশা মন্ডল, পাশের গ্রামে আমার বাড়ী। কোলকাতায় ডাক্তারী পড়া শেষ করে এই হসপিটালে আমার প্রথম চাকরী।
বিমলা – ডাক্তার বাবু রিপোর্ট আসতে কত সময় লাগবে।
ডাক্তার- ঘন্টা খানেকের মধ্যে আমি মোবাইলে পেয়ে যাবো। চিন্তা করবেন না। একটু বসুন। (ডাক্তার উঠে তিনজন রোগীর জ্বর চেক করলো)
(বিমল ও বিমলার স্বগতোক্তি)
বিমলা- দেখ নতুন ডাক্তার, বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে….
বিমল- থামতো, ডাক্তার বাবুর ব্যবহার কত সুন্দর। আমার ভরসা আছে। তুমি বড্ড বেশী ভাবছো।
বিমলা- না বলছিলাম এমনিতে গাঁয়ের হাসপাতাল তার ওপর ডাক্তার নতুন, আবার কমবয়সী ।
বিমল- সরকারী হসপিটাল কোয়ালিফায়েড ডাক্তার নার্স কি নেই এখানে? তাছাড়া শুভর তেমন কিছুই হয়নি ,শুধু জ্বর। ঠান্ডা লেগে টেগে হয়েছে বোধ হয়।
(ডাক্তার চেয়ারে বসে মোবাইল দেখতে লাগলো)
ডাক্তার- সৌরভের রিপোর্ট এসে গেছে স্যর। যা সন্দেহ করেছিলাম তাই। ডেঙ্গুর জার্ম পাওয়া গেছে।
বিমলা-বিমল -(দুজন একসঙ্গে) ডেঙ্গু!!
বিমলা- (কান্ন) হায় হায় কি হলো গো।
ডাক্তার- এভাবে কান্নাকাটি করবেন না। রোগীর অসুবিধা হবে। আমি আছি তো। শুনুন রোগীকে ভর্তি করতে হবে। কমপক্ষে সাতদিন। আমি ভর্তি করে নিচ্ছি। রোগীর কাছে কেউ একজন থাকতে চাইলে থাকতে পারেন। না থাকলে ও কোন অসুবিধা নেই।
নিন এই কাগজ গুলোতে সহি করুন।
(সহি করার পরে পর্দা নামলো)
৩য় পর্ব-
(৭ দিন পর বিমলার শুভ কে ডাকতে ডাকতে প্রবেশ)
বিমলা-শুভ, শুভ…..কোথায় গেল ছেলেটা ? এই সব বস্তির লোক, ছোট জাত । কদিন আগে ডেঙ্গু থেকে উঠেছে। ওদের সঙ্গে মিশতে না বলেছি। চারদিকে ডেঙ্গু মশার উপদ্রব।শুভ…. ও সৌরভ । কোথায় গেলিরে বাবা!(শুভর প্রবেশ)
শুভ- মা আমি এই তো। এত চেঁচাচ্ছ কেন? (সৌরভ এর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে)
বিমলা- চেঁচাচ্ছি কি সাধে? বাছা আমার(দীর্ঘশ্বাস) ।
শুভ- মা জান, আমার সঙ্গে পড়ে শচীন ও সিরাজের ডেঙ্গু হয়েছে,ওরা হাসপাতালে ভর্তি আছে।
বিমলা-তোকে পই পই করে বারন করেছি ওদের সঙ্গে মিশতে না।
শুভ- মিশবো না! একই পাড়ায় একই স্কুলে একই ক্লাসে.. মিশতেই হবে।
(বিমলের প্রবেশ)
বিমল- মিশতেই হবে, না মিশলে চলবে কি করে? তুমি একটু বুঝবার চেষ্টা কর মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, একে অপরের উপর নির্ভর করে আমরা বেঁচে থাকি।
বিমলা- তাই বলে ছোট জাত, ম্লেচ্ছ , মুসলমান এদের সঙ্গে মিশতে হবে?
বিমল- হবে বৈকি।
বিমলা-না, এই স্কুলে আর আমি শুভকে পাঠাবো না। শহরের কোন স্কুলে ভর্তি করবো।
(মাষ্টারের প্রবেশ)
মাষ্টার-তা কি হয় নাকি?
বিমল- নমস্কার
মাষ্টার-নমস্কার
বিমল-তা কি মনে করে মাষ্টার মশাই।
মাষ্টার -না এমনিই চলে এলাম। সৌরভের ব্যাপারে একটু খোঁজ খবর নিতে এলাম।
বিমল- খুব ভালো করেছেন।
মাষ্টার- দেখুন বৌদি, আমাদের সেদিন খুব ভুল হয়েছে। এই স্কুলে এর আগে কোনদিন এরকম ঘটনা ঘটেনি। মালিকে সব মাষ্টার মিলে খুব ধমক দিয়েছি। ভুল মানুষের একবার হয়। আপনারা খুব ভালো মানুষ তাই থানা পুলিশ করেন নি। আমি স্কুলের তরফ থেকে আপনাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
বিমলা-ক্ষমা চাইলেই সব মিটে গেল? না এর কোন ক্ষমা হয় না। আমি আমার বাচ্চা কে ওই স্কুলে আর পাঠাবো না। মুসলমান বস্তির ছোট জাতের নোংরা এদের সাথে আমার বাচ্চা একসঙ্গে বসবে?
বিমল- এসব কি বলছো? যত বড় স্কুলে যাও না কেন মুসলমান হোক ছোট জাতে হোক পাশেই বসতে হবে।
(শশী ডাক্তারের প্রবেশ)
শশী-এ আপনার অন্যায় জেদ বৌদি, আমি হাতুড়ে বা বড় ডাক্তার যাই হই না কেন জানবেন জাত ধর্ম নির্বিশেষে আমাকে সবাইর রক্ত পুঁজ ঘেঁটে চিকিৎসা করতে হয়।
বিমলা-আপনি তো আমার ছেলের রোগই তো ধরতে পারেন নি।
শশী- ধরতে পেরেছিলাম বলেই তো হাসপাতালে পাঠিয়ে ছিলাম। আপনার ছেলের সিমটম দেখেই পেঁপে পাতার রস পেরাসিটামল দিয়েছিলাম। ডেঙ্গুর মোক্ষম ওষুধ।
বিমলা-এত ভালো ডাক্তার এই গ্রামের হাসপাতালে ভাবতেও পারিনি। জান ভগবান ঠিক আছে।
বিমল- ভগবান ঠাকুর তুমি মান?
বিমলা-একি কথা, রাতদিন ঠাকুরকে ডেকেছি। হে ভগবান আমার ছেলেকে রক্ষা কর।
বিমল- তুমি শুধু তোমার ছেলের জন্য ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করেছিলে। গোটা গাঁ জুড়ে কত মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে তা জান? হাসপাতালে এই ডাক্তার আসার পরে একজন ও এখনো ডেঙ্গুতে মারা যায়নি। এসব খবর রাখ।
বিমলা-কি দরকার গাঁয়ের খবর রাখার?
( কল্যানির প্রবেশ)
কলা-মা, শুভকে স্কুল নিয়ে যেতে হবে না?
বিমলা- শুভ ঐ স্কুলে যাবে না।
(মাষ্টারের প্রবেশ)
মাষ্টার- না বৌদি এরকম বলবেন না। আমি এসেছি শুভকে সঙ্গে নিয়ে যাবো আপনার ছেলের দায়িত্ব আমার।
বিমলা- আয় শুভ আমার কাছে আয়। তোকে স্কুল যেতে হবে না।(শুভকে আগলে রাখে) আমি কিছুতেই আমার ছেলেকে ঐ স্কুলে পাঠাবো না।
বিমল- মাষ্টার মশাই নিজে ঘর বয়ে এসে নিয়ে যেতে চাইছেন। আর তুমি….
কলা- আমি ও সঙ্গে যাবো, স্কুল ছুটি পর্যন্ত বসে থাকবো, শুভর কোন অসুবিধা হবে না।
বিমলা-ওরে আমার প্রানের দোসর, শুঁড়ির স্বাক্ষী মাতাল। তুই ও ওদের দলে? হবে নাই বা কেন। তোর কি আর জাতের ঠিক আছে। তোর কারণেই আজ ছেলেটা এত ভুগলো। আজ থেকে তোকে আর এখানে কাজ করতে হবে না। আমার এরকম ঝি এর দরকার নেই।
কলা- গিন্নী মা দয়া করুন। কাজ ছেড়ে গেলে আমার সংসার বাঁচবে না।
বিমল- কল্যানীর দোষ কোথায়? তুমি যে জাত তুলে কথা বলছো তোমার নিজের জাতটা কি? তোমার বাবা তো সিডলকাষ্ট আমি ব্রাম্মন সন্তান হয়েও তোমাকে বিয়ে করেছি।
বিমলা-তুমি এদের সামনে আমার জাত তুলে খোঁটা দিলে?
বিমল-কেন দেবো না? তুমি রাতদিন এই গাঁয়ের মানুষের জাত ধর্ম নিয়ে খোঁটা দিয়ে যাবে? আর আমি সহ্য করবো ? এই গাঁয়ের মানুষের সেবার জন্য আমি এখানে ম্যানেজার হয়ে এসেছি।
(হাসপাতালের ডাক্তার বাইরে থেকে ডাক দেয় এবং প্রবেশ করে)
ডাক্তার-ম্যানেজার বাবু আছেন নাকি?
বিমল-হ্যাঁ, ডাক্তার বাবু! আসুন আসুন।
ডাক্তার- সৌরভ কেমন আছে?
(সৌরভ ডাক্তার বাবু কে প্রনাম করে সঙ্গে সঙ্গে বিমলা ও প্রনাম করতে যায়)
ডাক্তার- একি মাসীমা, আপনি আমার মায়ের সমান। (হাত ধরে বিমলাকে বিরত করে)
বিমল- ডাক্তার বাবু কি মনে করে?
ডাক্তার- এই গ্রামের যা পরিস্থিতি ডেঙ্গু মশার উপদ্রব বেড়েই চলেছে। আমি এখানে এসেছি মাত্র ছমাস , আমি যদি হাসপাতালে ষ্টেথিস্কোপ নিয়ে বসে থাকি তাহলে গাঁয়ের মানুষকে রক্ষা করা যাবে না বিশেষ করে বস্তি এলাকা। আমাকে ঘুরে ঘুরে এই এলাকার মানুষকে সচেতন করা ছাড়া উপায় নাই।
বিমল-সত্যি ডাক্তার বাবু আপনার মত ডাক্তারকে পেয়েছে এই গ্রাম –আপনি স্বয়ং ভগবান।
ডাক্তার- বাই দি বাই। সকাল আটটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত একেবারে সময় করতে পারছিনা। আমার একটা একাউন্ট খুলতে হবে।
বিমল-সে আবার এমন কি। আপনাকে ব্যাংকে যেতেই হবে না, আমি আপনার কাছে পৌঁছে যাবো। এটা আমার ডিউটি। আপনি আমার ছেলের জীবন বাঁচিয়েছেন। স্বর্গের দেবতা যেন মর্ত্যে নেমেছেন।
(ফকির বাইরে থেকে)
ফকির- মা দুটি ভিক্ষা দিবেন।
বিমল-কল্যানী, ফকির সাহেব আমার ঘরে ঢুকবেন না, তুমি তাঁকে ডেকে নিয়ে এসো।
বিমলা- ফকির সাহেব-( ভেঙ্গচি কেটে) খবরদার, ফকির যেন আমার ঘরে পা না রাখে।
কলা- গিন্নীমা না বলছেন আমি….
বিমল-তোমায় ভাবতে হবে না। তুমি যাও। গিন্নীমা মানুষ চিনতে পারেনি। তাঁর পরিচয় পেলে গিন্নীমাই তাঁর পায়ে পড়বেন। আজ দেখো গিন্নীমার চোখ খুলে দেবো। তিনি ফকির নয় আমীর। ডাক্তার- সারা জীবন ধরে ভিক্ষাই করে গেলেন। ভিক্ষা তাঁর নেশা ও পেশা। তিনি পিতা মাতা আল্লা তিনি ভগবান।
(কলা ফকিরের হাত ধরে নিয়ে এলো)
ফকির- ম্যানেজার বাবু আমাকে এখানে ধরে আনলেন কেন? আপনার পরিবার আপনার ঘরে আসতে মানা করেছে।
বিমল- আপনি স্বয়ং ভগবান পীর। আপনার ছেলে ডাক্তার বাবু আমার ছেলের জীবন দান করেছে। আপনি কেন অজাত কুজাত ফকির হবেন। আমার স্ত্রী না বুঝে আপনাকে জাত ধর্ম তুলে অপমান করেছে। আপনি আমার স্ত্রীর অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের আবরণ খুলে দিয়ে যান। আর কোনদিন যেন মানুষ কে সে হীন চোখে না দেখে। চোখের ঢুলি খুলে দিন। অন্ধকার থেকে আলোয় আনুন।
বিমলা- (ফকির সাহেবের পা ধরে) আপনি আমার ঠাকুর। আমি কি ভুল করেছি। ডাক্তার বাবু …আপনার ছেলে আগে যদি জানতাম।
ফকির- কি আগে কি পরে! মানুষের জাত ধর্ম মানুষই হয়। সবার শরীরে একই রক্ত। অনেক কষ্টে ডাক্তারী পড়িয়ে মুসলমান ফকির মন্ডলের ছেলে বাদশা মন্ডল কে মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব সঁপেছি। সবই আল্লা ভগবানের দোয়া।
আসুন সবাই আমরা একসঙ্গে বলি —
আমরা মানুষ ভাই ভাই ছাড় জাত ধর্ম
ভেদাভেদ কিসের তরে কর যে যার কর্ম।
জাত ধর্মের ভেদাভেদ নিপাত যাক
মানুষের ভেদাভেদ নিপাত যাক।
–শেষ–
